Home / গল্প / আমার বাবা-মায়েরও প্রেমের বিয়ে ছিলো
love with romance - valobasha - prem - sexy girl

আমার বাবা-মায়েরও প্রেমের বিয়ে ছিলো

টিএসসি তে চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে আছি ১০ মিনিট হলো। শুভ্রর এখনো আসার খবর নেই। আমাকে বলেছিলো ঠিক দুপুর দুইটা ত্রিশ মিনিটে উপস্থিত থাকতে। আমি কখনো কোন কাজে সময়ানুবর্তী নই। সব জায়গাতে ১ মিনিট হলেও লেইট করি। কিন্তু শুভ্রর সাথে দেখা করার জন্য আমি ঠিক সময়ে উপস্থিত হই সবসময়। ১০ মিনিট ধরে একজন সুন্দরী মেয়ে একলা রাস্তার পাশে বেঞ্চে বসে থাকবে আর আশেপাশের মানুষজন তাকাবেনা কিংবা সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ধাক্কা দিতে চেষ্টা করবেনা এটা বাংলাদেশে সম্ভব নয় এখন। বাধ্য হয়ে দোকানের পিছনের দেয়ালে গিয়ে বসলাম। পিছনে একটা গাছ থাকায় ছায়া পাওয়া যাচ্ছে। আবার ফোন দিলাম শুভ্রকে। এই নিয়ে ৮ বার ফোন দিলাম কিন্তু রিসিভ করছেনা ও। দোকানের ছেলেটাও বার বার তাকাচ্ছে আমার দিকে বিরক্ত হয়ে। অনেক্ষণ হলো বসে আছি কিন্তু কিছু অর্ডার করছিনা। বিরক্ত হয়ে তাকানোটাই স্বাভাবিক। আবার তাকাতেই ডাক দিয়ে বললাম, ” এই ভাইয়া, ১ কাপ মরিচ চা দাও তো। ”
.
ছেলেটার মুখের বিরক্তি ভাব কমলো। তাড়াতাড়ি চায়ের কাপ এনে রাখলো আমার সামনে। এক চুমুক দিতেই বমি চলে আসলো। এর আগেও তো মরিচ চা খেয়েছি কিন্তু আজকে এরকম লাগছে কেন? আরেক চুমুক দিবো কিনা ভাবছি এই সময় শুভ্র কল দিলো। রিসিভ করতেই তার ব্যস্ত কন্ঠস্বর শুনলাম।
.
” হ্যালো তানু, কই তুই? ”
.
” টিএসসিতে বসে আছি। চা খাচ্ছি। ”
.
” আচ্ছা বসে থাক আমি চলে এসেছি অলমোস্ট।”
আমি কিছু বলার আগেই লাইন কেটে দিলো। আমার নাম তনিমা। নামটা এমনিতেই ছোট তারপরেও শুভ্র এই নামকে ভেঙ্গে তানু বানিয়ে ফেলেছে। আমার বড় নাম ধরে ডাকতে নাকি তার বিরক্ত লাগে।
.
চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে আরেক চুমুক দিতেই আবার বমি চলে আসলো। ধুর বলে ফেলে দিলাম চা টা। দোকানের ছেলেটা অবাক হয়ে দেখছে আমার চা ফেলে দেয়াটা। তার বানানো চা দুই চুমুক খেয়ে ফেলে দেয়াতে তার মুখে অপমানিত হওয়ার ছায়া। ছেলেটাকে ডেকে আবার মাল্টা চা দিতে বললাম। ছেলেটা মুখ কালো করে আবার চা দিয়ে গেলো। শুভ্র ফোন দিয়েছে ১৫ মিনিট হয়ে গিয়েছে কিন্তু এখনো আসার খবর নেই। ও কখনো এরকম দেরি করেনা। আজকে কেনো এরকম করছে বুঝতে পারছিনা। টেনশন হচ্ছে তার সাথে মেজাজ খারাপ। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে চুমুক দিলাম। ওহ্ খোদা, এই ছেলে তো আড়াই ইঞ্চি সাইজ কাপে তিন ইঞ্চি চিনি দিয়েছে। এই চাও খাওয়া সম্ভব না আমার পক্ষে। ফেলে দিলাম আবার। ছেলেটা এবার অপমানিত হওয়ার সাথে সাথে অবাকও হয়েছে অনেক। ৩৫ মিনিট হচ্ছে আমি এখানে বসে আছি কিন্তু শুভ্র এখনো আসছেনা। প্রচণ্ড রাগ লাগছে আমার। কেনো আমি শুভ্রর জন্য এতোক্ষণ বসে থাকবো? কে হয় ও আমার? কেউ না। একটা ছেলের সাথে একটা মেয়ের যেসব সম্পর্ক হতে পারে তার কোনোটাই ওর সাথে আমার নেই। ২ বছর আগে ফেসবুকে ওর সাথে আমার পরিচয়। একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে জব করে ও। আর আমি তখন অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। সদ্য প্রেমে বিফল হয়ে মানসিক ভাবে অস্থির আমি হঠাৎ করেই শুভ্র নামের ছেলেটার সাথে পরিচিত হলাম। ফেসবুকে কথা বলতে গেলেই ঝগড়া লেগে যেতো ওর সাথে। জীবন আর প্রেম নিয়ে অনেক ফিলসফিকাল কথাবার্তা বলতো ও আর আমি বিরক্ত হতাম। লেগে যেতো ঝগড়া। ওর একটাই কথা যে আমি বাচ্চা মেয়ে সেজন্য আমি জীবন, প্রেম এগুলোর কিছু বুঝিনা। এসব প্রেম ভালোবাসা জাস্ট ন্যাকামি। আমার থেকে মাত্র ৬ বছরের বড় হয়েই এমন ভাব করতো যেন দার্শনিক প্লেটোর ছোট ভাই।
.
একদিন ঝগড়ার এক পর্যায়ে বলেই ফেলেছিলাম, ” এতো যে প্রেম নিয়ে ফিলসফি আউড়াচ্ছেন কয়টা প্রেম করেছেন যে প্রেমকে ন্যাকামি ছাড়া কিচ্ছু মনে হয় না?”
কিছুক্ষণ থেমে গিয়ে শুভ্র উত্তর দিয়েছিলো, ” মিস তনিমা, আমার একটা প্রেম ছিলো। ৫ বছর প্রেম করেছিলাম আমি। কিন্তু যার সাথে প্রেম করেছিলাম সে পাঁচ বছর পরে হঠাৎ করেই একদিন জানিয়ে দিলো আমাকে বিয়ে করা সম্ভব না তার। Because I am a broken family boy. ৫ বছর প্রেম করার পরে সে বুঝতে পেরেছিলো আমাকে তার ফ্যামিলি মানবেনা। আমিও আর কিছু বলিনি। যে যেতে চায় তাকে আটকে রাখা যায় না। আমিও চেষ্টা করিনি। যেতে দিয়েছি তাকে। ”
.
” শুধু এজন্যেই কি আপনি প্রেম, ভালোবাসাকে ন্যাকামি বলেন? ”
.
” না। আমার বাবা-মায়েরও প্রেমের বিয়ে ছিলো। ২ বছর প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন উনারা। কিন্তু কয়েকবছর পরে আমার বাবার কোনো ভালোবাসা ছিলোনা আর আমার মায়ের প্রতি। উনি অন্যমেয়েকে ভালোবাসতে শুরু করলেন। ডিভোর্স হয়ে গেলো উনাদের। আমাকে আর মাকে রেখে বাবা নতুন সংসারে মনোনিবেশ করলেন। ”
.
“আপনাদের সাথে আপনার বাবার যোগাযোগ নেই?”
.
” না। উনি অনেক যোগাযোগ করতে চেয়েছিলেন আমার সাথে। কিন্তু উনাকে বলে দিয়েছিলাম যে আমি আর উনাকে বাবা বলে মানি না। আমি আমার কথা থেকে কখনো নড়ি না। আজও উনার সাথে আমাদের কোনো যোগাযোগ নেই। ”
.
সেদিনের পর থেকে শুভ্রর সাথে আমার ভালোমতো কথা শুরু হলো। সে আপনি থেকে ঝপ্ করে তুই য়ে নেমে এলো আর আমি তাকে আপনি করেই বলতে লাগলাম। ছেলেটার প্রতি একটা অদ্ভুত মায়া কাজ করতো আমার। আমরা দুজনেই ঠিক করেছিলাম আমাদের ভেতর কোনো সম্পর্ক হবেনা। আমরা হাসবেন্ড-ওয়াইফ, বয়ফ্রেন্ড- গার্লফ্রেন্ড, ভাই-বোন, জাস্ট ফ্রেন্ড কিচ্ছু হবোনা। প্রতিমাসে কখনো দুবার অথবা একবার দেখা হয় আমাদের। দেখা হলে একসাথে বসে চা খাই, রাস্তায় হাটি এরপরে যে যার গন্তব্যে চলে যাই।
.
ঠিক ৫৫ মিনিট পরে শুভ্র এলো রিক্সায় করে। দূর থেকে রিক্সায় ওকে দেখে আমার বুকের ভেতর একটু ব্যথার মতো হলো। প্রতিবার ওকে দেখলেই এমন হয় আমার। লম্বা, ফর্সা, রোগা সুদর্শন একটা ছেলে। সারাক্ষণ তার চুলগুলো থাকবে এলোমেলো হয়ে। দেখলেই ইচ্ছে করে হাত দিয়ে চুলগুলো আরো এলোমেলো করে দেই। কিন্তু ওকে স্পর্শ করতে ভয় লাগে আমার। একটুতেই বিরক্ত হয় ও। আজকেও ইচ্ছে করছে চুলগুলো নিয়ে খেলতে। রিক্সা থেকে নেমেই আমার দিকে তাকিয়ে একটা বোকা বোকা হাসি দিলো। এই হাসি দেখে যেকোনো মেয়ের বুকে ঝড় শুরু হবে। আমিও একজন মেয়ে। ঝড় এর আগে আমার বুকেও উঠেছে কিছু পাত্তা দিলাম না আমি আজকে। ঝড়ের চেয়ে রাগ উঠছে আমার বেশি। ৫৫ মিনিট আমাকে বসিয়ে রেখেছে। আমি তখন একটা লেবু চা, এরপরে আবার গুড়ের চা অর্ডার করে ফেলে দিয়ে শুধু চায়ের লিকারে চুমুক দিচ্ছি।
.
শুভ্র এসে ধপ্ করে আমার পাশে বসে দোকানের ছেলেটাকে ডেকে বললো, ” এই পিচ্চি আমাকে বেশি করে দুধ আর চিনি দিয়ে চা দে তো। ”
.
সিগারেট ধরাতে ধরাতে শুভ্র আড়চোখে আমাকে দেখলো আবার। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললো, ” রেগে গেলে যে তোর নাকটা পাকা টমেটোর মতো ফুলে লাল হয়ে যায় সেটা কি তুই জানিস?”
.
আমি উত্তর দিলাম না। চা খাওয়া শেষ আমার। ছেলেটা শুভ্রকে চা দিতে এলে জিজ্ঞেস করলাম, ” পাঁচটা চায়ের দাম কতো হয়েছে? ”
.
ছেলেটা একবার শুভ্রর দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলো, ” ৪০ টাকা হইছে আপু।”
.
আমি ব্যাগ থেকে টাকা বের করছি আর শুভ্র বলে উঠলো,
.
” ফকিন্নির মতো করছিস কেন? টাকা যেহেতু দিবি তো আমারটা সহ দে নয়তো আমি দিচ্ছি তোরটা সহ। ”
আমি শুভ্রর দিকে অগ্নিদৃষ্টি দিয়ে কিছু না বলে ছেলেটার হাতে ৪০ টাকা ধরিয়ে দিলাম। শুভ্র ছেলেটাকে ইশারা করছিলো টাকাটা না নিতে কিন্তু ছেলেটা ওর ইশারা বুঝলোনা নাকি আমার ভয়ে টাকাটা নিলো বুঝা গেলোনা।আমি উঠে হাঁটতে শুরু করলাম। শুভ্র তাড়াতাড়ি চায়ের কাপটা রেখে ছেলেটাকে টাকা দিয়ে দৌড়ে আমার পাশে এসে হাঁটতে শুরু করলো।
.
“আরেহ্ এতো রাগ করার কি আছে? একটু না হয় দেরি হয়েছে আর কি। ”
.
“একটু মানে? ৫৫ মিনিট আপনার কাছে একটু লাগে?”
“আচ্ছা স্যরি তো। বের হতে যাবো তখন বস ইম্পর্টেন্ট একটা ফাইল ধরিয়ে দিলো। আমি কি সবসময় দেরি করি বল? ”
.
ভার্সিটির ভেতরে ঢুকে হাঁটছি তখন আমরা। একটা ভ্যানে বসে একটা মেয়ে ছুরি দিয়ে পেঁয়াজ,শষা, ধনেপাতা কাটছে। পাশেই একটা লোক ফুচকা বিক্রি করছে। মেয়েটা ফুচকাওয়ালাকে এগুলো কেটে দিচ্ছে দেখে বুঝা গেলো। মেয়েটার পাশে আবার এক বালতি ভর্তি গোলাপফুল। শুভ্র গিয়ে মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলো, ” বসতে পারি এখানে? ”
.
মেয়েটা একটু সরে গিয়ে বললো, “বসেন ভাইয়া।”
শুভ্র এবার আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ” তানু ম্যাডাম, এখানে বসবেন? আমার পা ব্যথা করছে অনেক। হাঁটতে পারছিনা। ”
.
আমি কিছু না বলে বসে পড়লাম। হঠাৎ করেই একটা পিচ্চি এসে শুভ্রর পায়ে ধরে ঝুলতে শুরু করলো হাসতে হাসতে। পিচ্চির বয়স বছর তিনের মতো হবে। একটা আধময়লা ফ্রক আর পায়জামা গায়ে দিয়ে খুশি মনে শুভ্রর পায়ে ঝুলতে ঝুলতে খেলছে।
ভ্যানের উপরের মেয়েটা দেখতে পেয়ে পিচ্চিটাকে ধমক দিলো , ” লামিয়া, ছাড় ভাইয়ারে। এদিকে আয়। মাইর দিমু না আইলে।”
.
শুভ্র হেসে দিয়ে বললো, “লামিয়ার মা, তোমার লামিয়া আমার উপকার করছে। পায়ে অনেক ব্যথা এমনিতেই। ওকে ঝুলতে দাও ইচ্ছেমত। ”
.
আমি এবার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ” আপনি জানলেন কিভাবে এই ছোট্ট মেয়েটা লামিয়ার মা? ”
.
“না বুঝার কিছু নেই। পিচ্চিরা একমাত্র মায়ের সামনেই অপরিচিত মানুষের সাথে দুষ্টুমি করার সাহস পায় এবং মায়ের ধমক কে পাত্তা না দিয়ে দুষ্টুমি করতেই থাকে।”
.
আমার বিশ্বাস হচ্ছিলোনা শুভ্রর কথা। এই মেয়ে তো নিজেই ছোট। ওর আবার বাচ্চা হবে কিভাবে? তারপরেও মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলাম, ” লামিয়া তোমার মেয়ে? ”
.
মেয়েটা লাজুক হেসে হ্যাঁসূচক মাথা নেড়ে উত্তর দিলো। আমাকে সবসময় শুভ্র এরকম ভাবে ওর অনুমান শক্তি দিয়ে অবাক করে দেয়। এবার আমি ভাবলাম আমিও ওকে একটু বুঝিয়ে দেই যে আমার অনুমান শক্তিও খারাপ না। মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলাম, ” ওই ফুচকাওয়ালা তোমার বর, না? ”
.
মেয়েটা আরো বেশি লজ্জা পেয়ে গেলো আর শুভ্র অনেক জোরে হেসে উঠলো।
.
“এতো জোরে হাসির কি আছে? ”
.
“তোর অনুমান শক্তি দেখে হাসছি।”
.
” আমার অনুমান নিয়ে হাসার কি আছে?”
.
” কারণ ওই ফুচকাওয়ালা লামিয়াদের প্রতিবেশী ।”
.
” আপনি কিভাবে বুঝলেন?”
.
” এতো ব্যাখ্যা দিতে পারবোনা। লামিয়ার মাকে জিজ্ঞেস করে শিওর হয়ে নে। ”
.
কথাটা বলেই শুভ্র শিস বাজাতে শুরু করলো।
মেয়েটার দিকে তাকাতেই দেখলাম মেয়েটাও হাসছে। তার হাসি বলছে শুভ্রর কথা সত্যি। মেয়েটা অনেক মজা পাচ্ছে আমাদের কথা শুনে।
.
শুভ্র এবার ভ্যান থেকে নেমে লামিয়ার হাত ধরে হেঁটে একটু দূরে গিয়ে এক চা বিক্রেতার কাছ থেকে মুড়ির মোয়া কিনে দিলো।
.
লামিয়া এবার লাফাতে লাফাতে এসে ওর মাকে মোয়াটা দেখাতে লাগলো। আমি হাত বাড়িয়ে লামিয়ার কাছে মোয়াটা চাইলাম। লামিয়া ছুটে গিয়ে শুভ্রর পেছনে লুকালো যেন আমি মোয়াটা নিতে না পারি। এই ছেলেটা এক নিমিষেই সবার মন জয় করতে পারে। আমার কেন জানি হঠাৎ খুব কষ্ট হচ্ছে। বুকটা ফেটে কান্না আসছে। শুভ্রর সাথে প্রথম দেখা হওয়ার পর থেকেই এমন হচ্ছে আমার। আমি মনে হয় শুভ্রকে ভালোবেসে ফেলেছি। কিন্তু আমি বলতে পারছিনা ওকে। কারণ আমি বললেই ও চলে যাবে দূরে। অনেক দূরে। এখন তো ওকে তাও দেখতে পারছি কিন্তু পরে ওকে আর চোখের দেখাও দেখতে পারবোনা আমি। সেজন্য হাজার কষ্ট হলেও বুঝতে দিচ্ছিনা আমি যে ওকে কতো ভালোবাসি।
.
অনেক্ষণ ভ্যানে বসে থেকে শুভ্র আর লামিয়ার খেলা দেখছি আমি। মনে হচ্ছে একটা না, দুটো শিশু খেলছে আমার সামনে। যতোবার শুভ্রর দিকে আমার চোখ পরছে আমার বুকটা কেঁপে উঠছে। শুভ্রও আজকে কিভাবে যেন তাকাচ্ছে আমার দিকে। ওর চোখের দৃষ্টি আজকে অন্যরকম। লামিয়া একটু পর পর শুভ্রর কাছে এক একটা খাবার খেতে চাচ্ছে আর শুভ্র কিনে দিয়ে বলছে, ” সব যদি একসাথে খেতে চাস কিভাবে হবে রে? ”
.
লামিয়া ওর উত্তরে ছোট ছোট দাঁত বের করে ভুবন ভোলানো হাসি দিচ্ছে।
.

আমাদের যাবার সময় হতেই শুভ্র লামিয়াকে কোলে নিয়ে ওর মায়ের পাশে এনে বসিয়ে দিলো। আমি ভ্যান থেকে নামতে যাবো তখন শুভ্র আমার সামনে এসে বললো,
.
” তানু তোকে একটা ইম্পর্টেন্ট কথা বলতে চাই আজকে।”
.
” হুম, বলেন।”
.
হঠাৎ করেই আমাকে প্রচণ্ড অবাক করে দিয়ে শুভ্র দুই হাত দিয়ে আমার মুখটা ধরলো। আমি কেঁপে উঠলাম। এই প্রথম শুভ্র আমায় স্পর্শ করলো। আমার মুখটা টেনে ওর মুখের সামনে এনে বললো, ” তানু, আমি বলেছিলাম দুজন নর-নারীর ভেতর যেসব সম্পর্ক হতে পারে তার কোনোটাই আমাদের ভেতর হবেনা। কিন্তু আমি আমার কথা রাখতে পারিনি। আমি তোমাকে অনেক বেশি ভালোবেসে ফেলেছি। অনেক মানে অনেক বেশি। ”
.
এটা বলেই ও আমার চোখের দিকে তাকালো। আমার চোখের ভাষা ও বুঝতে পারছে নাকি জানিনা। আমার চোখে তখন একসাথে ভালোবাসা, অবাক হওয়া, লজ্জা, অভিমান, ভয়, রাগ সব খেলা করছে। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ও কি বুঝবে আমিও যে ওকে প্রচণ্ড ভালোবাসি?
.
আমি কথা বলতে চাইলাম কিন্তু ও আমার ঠোঁটে হাত দিয়ে আমাকে থামিয়ে দিলো। ও আবার বলতে শুরু করলো,
.
” তানু, তোমাকে কিছু বলতে হবেনা। আমি জানি তুমি কি বলতে চাচ্ছো। আমি কথা দিয়ে কথা রাখতে পারিনি তানু। আমি লজ্জিত। আমি আর কোনোদিন তোমার সামনে আসবোনা এবং যোগাযোগ করতে চেষ্টা করবোনা। ভালো থেকো তুমি। ”
.
আমার মুখ দিয়ে তখন কোনো কথা বের হচ্ছেনা। কিভাবে ওকে বুঝাই যে এতে লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই? ওকে যে আমিও অনেক ভালোবাসি।
.
শুভ্র এবার আমার কপালে একটা চুমু দিয়ে হন্ হন্ করে হেঁটে চলে গেলো। একটা বারও পেছনে ফিরে তাকালোনা। আমি যে কান্না করছি পাগলের মতো একটা বারও ফিরে দেখলোনা। লামিয়ার মা আমার হাত ধরে আমাকে শান্ত করতে চেষ্টা করলো। লামিয়াকে বলতে লাগলো,
.
” দৌড়াইয়া যা লামিয়া। ভাইয়ারে ডাইকা আন। ”
আমি সাথে সাথে চোখ মুছে ভ্যান থেকে নেমে চলে যেতে যেতে মেয়েটাকে বললাম, ” লামিয়াকে কোথাও যেতে হবেনা। ও আর ফেরত আসবেনা।”
.
কান্না করতে করতে আমি আবার টিএসসিতে চলে এসেছি। হাজার চেষ্টা করেও আমি কান্না থামাতে পারছি না। এদিকে সূর্য ডুবছে, সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে৷ শুভ্রকে ফোন দিতে খুব ইচ্ছে করছে আমার কিন্তু সাহস পাচ্ছিনা ফোন দিতে। আমি আনমনে হাঁটতে শুরু করলাম আবার। যে দোকানটায় বসে শুভ্রর জন্য অপেক্ষা করছিলাম, সেটার সামনে আসতেই দোকানের সেই ছেলেটি দৌড়ে এলো। আমাকে ডাকছিল অনেক্ষণ ধরে নাকি। আমি শুনতে পাইনি। ছেলেটির দিকে ফিরে তাকাতেই বলল,
.
“এইটা কেমন কথা আপু? ভাইয়া না হয় দেরি কইরা আসছে তাই বইলা এতো ঝগড়া করতে হবে?”
আমি অনেক অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, “কি হয়েছে ওর?”
.
ছেলেটি মুখ কালো করে উত্তর দিলো, “ভাইজান সেই কখন থেইক্কা বইসা বইসা খালি সিগারেট টানতেছে। চোখে পানি, আমি আপনারে আশেপাশে অনেক খুঁজছি। কিন্তু আপনারে আর পাই না। এখন দেইখাই ডাক দিলাম আপনারে। ”
মুহুর্তেই বুকটা কেঁপে উঠলো। আমি গিয়ে দেখলাম ঠিক তো! হ্যাবলাকান্তটা বসে আছে মুখ কালো করে হাতে সিগারেট নিয়ে।
.
আনমনে হাসলাম আমি, এইবার ৫৫ মিনিটের শাস্তি হিসেবে তাকে ভরকে দেয়া যায়।
আমি গিয়ে শুভ্রর পাশে বসলাম, মুখে গম্ভীর ভাব।
.
শুভ্র শুকনো মুখে আমার দিকে তাকালো। কিছু বলতে চাচ্ছে কিন্তু পারছে না। আমি রাগিত স্বরে বললাম,
.
” শুভ্র সাহেব, আপনাকে আমি খুঁজছি আর আপনি এখানে বসে আছেন? আপনার সাথে আজকে দেখা করেছি কেনো জানেন? আপনাকে একটা মেয়ে অনেক ভালোবাসে। মেয়েটা আমার পরিচিত। আমাকে বলেছিলো আপনাকে যেন তার কথা বলি। আমাকে বলতেই দিলেন না আপনি কিছু। ”
.
” তানু প্লিজ আমাকে একটু একা থাকতে দে। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। বিরক্ত করিস না আমাকে। তোকে যা বলেছি ভুলে যা। আমি আর যোগাযোগ করতে চেষ্টা করবোনা তোর সাথে।”
.
” আপনার একটুও জানতে ইচ্ছে করছেনা মেয়েটার নাম?”
.
” না, আমার একটু একা থাকতে ইচ্ছে করছে। প্লিজ একা থাকতে দে আমাকে।”
.
” সত্যিই জানতে ইচ্ছে করছেনা?”
.
” বললাম তো না।”
.
এবার আমি সাহস করে শুভ্রর এলোমেলো চুলে হাত দিয়ে ইচ্ছেমত আরো এলোমেলো করে দিলাম। শুভ্র অনেক অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালো। ওর হাতের সিগারেট টা ফেলে দিয়ে ওর কানের কাছে মুখটা নিয়ে আস্তে করে বললাম, ” মেয়েটার নাম তনিমা। শুভ্রর তানু। ”
.
.
(সমাপ্ত)
.
.
লিখাঃ Tasnim Tasmia

Facebook Comments

About Priyo Golpo

Check Also

হুইসেল-whistle-abdul-zabbar-khan-jiboner-golpo

হুইসেল । Whistle

বিকেল পাঁচটার দিকে ঢাকা ইউনিভার্সিটি টিএসসি’র সামনে থেকে একটা রিকশা নিলাম। প্যাসেঞ্জার সুমি এবং আমি। …

error: Content is protected !!