Home / গল্প / গল্প বিচিত্রা – আপনার পড়া উচিত

গল্প বিচিত্রা – আপনার পড়া উচিত

(১)
আজকে বিচিত্রা খুলে অদ্ভুত একটি বিজ্ঞাপন দেখলো সুমি। একজন প্রবাসী লিখেছেন,” আইডিয়াল স্কুল এবং কলেজের সেইসব বন্ধুদের চিঠি লেখার অনুরোধ করছি একদিন যাদের সঙ্গ পেয়ে আজ নিঃসঙ্গতায় ভুগছি।” সুমির বহু দিনের শখ অচেনা, অজানা কারো সাথে বন্ধুত্ব করবার। ভদ্রলোক যে শর্ত জুড়ে দিয়েছেন তাতে তার চিঠি লেখা উচিত না, কারণ স্কুল বা কলেজে কোনটাতেই সে লোকটির সহপাঠী ছিল না। কিন্তু তবুও সে ঠিক করল চিঠি পাঠাবে। লোকটা আর কি করবে, উত্তর দেবে না, এর চেয়ে খারাপ কিছু তো আর হবে না।
(২)
গল্পটির আরো ভেতরে ঢুকবার পূর্বে আপনাদের সুমি সম্বন্ধে দু-একটা কথা বলবার প্রয়োজন রয়েছে।ও বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে চতুর্থ বর্ষে পড়ালেখা করছে। মেডিকেল কলেজের পড়ালেখা সম্বন্ধে যাদের ধারনা নাই তারা ভাবতেই পারবেন না চতুর্থ বর্ষ কতটা কঠিন। একসাথে তিনটা বিষয় নিয়ে পড়ালেখা করতে হয়। প্যাথলজি মাইক্রোবায়োলজি আর ফার্মাকোলজি। এই কঠিন সব পড়া রেখে ওর ঢাকায় আসবার কোনই ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু তার বাবা খুবই কঠিন এক মানুষ। রোজার ঈদের ছুটিতে তার মেয়ে ঢাকায় আসবে না এটা তিনি কখনোই হতে দেবেন না। তিনি শুধু ওকে ঢাকায় এনেই ক্ষান্ত হননি, ওকে ঠিক মতো পড়ালেখাও করতে দিচ্ছেন না। আর তাই চাঁদ রাত হবার সুবাদে মেডিকেলের মোটা বইয়ের পরিবর্তে তাকে এখন বিচিত্রা পড়তে হচ্ছে।সেখানেই ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপনে এসে এই প্রবাসী ছেলেটির বিজ্ঞাপনটিতে চোখ আটকে গেল।
(৩)

শনিবার দিনটি রাজিবের খুব খারাপ যায়। সাধারণত সেদিন কোনো দেশের চিঠি আসে না। শনিবার যে আমেরিকাতে কোনো চিঠি বিলি হয় না ,তা নয় কিন্তু। হয় ,তবে কম হয়। অধিকাংশ শনিবার মেইল বক্স খুলে মেজাজ খারাপ হয়ে যায় রাজিবের। শুধু বিল আর বিল। তবে আজ রাজিব এর জন্য একটি অন্য রকম চমক অপেক্ষা করছিল। মেইল বক্সে সুমি নামে একটি মেয়ের চিঠি।কদিন আগে সে বিচিত্রায় একটি ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন পাঠিয়েছিল। স্কুল-কলেজের হারিয়ে যাওয়া বন্ধু বান্ধবদের সাথে যোগাযোগের একটা ব্যর্থ প্রয়াস।যে সময়ের কথা বলছি তখনও ফেসবুক শুরু হয়নি। হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের খুঁজে পেতে এভাবেই ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন দিতে হতো। এখন পর্যন্ত অবশ্য কাজের কাজ কিছু হয়নি। কোন বন্ধুই এখনো তাকে চিঠি লিখে নি। এখন পর্যন্ত এই চিঠিটা ছাড়া আর একটি চিঠি সে পেয়েছে। ফালতু একটা চিঠি, মফস্বলের একটি মেয়ে অর্থ সাহায্য চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। আর তাই আজকে চিঠিটা খুলতে তার মন সায় দিচ্ছে না। সুমি নামে সে কাউকে চিনে না। এটাও অর্থ সাহায্য চেয়ে আর একটা চিঠি হতে পারে।তবে লেখা আছে মেয়েটি নিউ লেডিস হোস্টেলে থাকে। চিটাগাং মেডিকেল কলেজ।ডাক্তারি পড়ে এমন একজন কেউ ফালতু চিঠি লিখবে পড়ালেখা বাদ দিয়ে , তার সম্ভাবনা খুবই কম। খুলবে না খুলবেনা করেও শেষ পর্যন্ত কৌতূহলের কাছে পরাজিত হলো রাজিব। খামটা দেখতে কি সুন্দর। নীল খামের চারদিকে আবার মাল্টি কালারের বর্ডার দেওয়া। এমন একটা চিঠি কেউ না খুলে কি থাকতে পারে?রাজিব যখন চিঠিটি খুলবার জন্য হাতে নিল তখন চারদিক অন্ধকার করে সবে সন্ধ্যা নামছে ডেন্টন নামের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের সেই ছোট্ট সুন্দর শহরটিতে।
(৪)
চিঠিটা খুলে রাজিব অভিভূত হয়ে গেল মেয়েটির ভাষা জ্ঞান দেখে। কি সুন্দর ঝরঝরে গদ্য আর মুক্তার মতো হাতের লেখা। তার ধারণা ছিল ডাক্তারদের হাতের লেখা খুব খারাপ হয়, মেয়েটি যদিও এখনও পুরোপুরি ডাক্তার হয়নি, তবে দোরগোড়ায়। মেয়েটি চিঠি শুরু করেছে এইভাবে,”সুপ্রিয়, আমার বহুদিনের শখ অচেনা, অজানা একজনের সাথে বন্ধুত্ব করব। বিচিত্রায় আপনার ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন টি দেখে আমি ঠিক করেছি আমার সেই শখ পূরণ করব। কারো সাথে বন্ধুত্ব করতে হলে তাকে একটি গোপন কথা বলতে হয়। আমি আপনাকে একটি গোপন কথা বলি। আমার পরিবারের সবার ধারণা আমি খুবই ভালো ছাত্রী। কিন্তু আমার ধারণা আসন্ন থার্ড প্রফ পরীক্ষাটি আমি পাস করতে পারব না। আমার প্রায়ই মনে হয় আমি হব সেই সব ছাত্রীদের একজন, যারা প্রচন্ড আগ্রহ নিয়ে মেডিকেলে পড়তে এসে শেষ পর্যন্ত পড়া শেষ করতে পারে না । এবার আপনার পালা। আপনি আমাকে আপনার জীবনের একটা গোপন কথা বলবেন যা কেউ জানে না। আজকে এ পর্যন্তই! ইতি ,আপনার চিঠির উত্তরের অপেক্ষারত , সুমি।”
(৫)
সব প্রতীক্ষাই বিরক্তিকর,তবে চিঠির জন্য প্রতীক্ষার মত বিরক্তিকর বুঝি আর কিছুই নেই, এই পৃথিবীতে। তবে সব প্রতীক্ষার ই একদিন শেষ হয়। এটাও হল। এক মধ্য দুপুরে কলেজ থেকে ফিরে সুমি ওর টেবিলের উপর একটি খাম দেখতে পেল। খামটির উপরের ডান কোনায় যেখানে ডাকটিকেট থাকে, সেখানে দুটি আমেরিকান ফ্লাগ এর ছবি। সুমির কাছে মনে হল ওর হার্টটা যেন দুটো বিট মিস করলো।
(৬)
প্রিয়তমেষু,
আপনি লিখেছেন আপনি আমার বন্ধু হতে চান।বন্ধুত্বের শর্ত হিসেবে একটা গোপন কথা ও জানতে চান।অথচ বন্ধু হতে হলে যে একে অপরকে তুমি করে বলতে হয় এটা কি আপনি জানেন না? তাই আমি ঠিক করেছি আমি এখন থেকে আপনাকে তুমি করে বলবো। তুমি একটা গোপন কথা জানতে চেয়েছ, কথাটা খুবই লজ্জার। তাও তোমায় বলি। আমার প্রায় ২৬ বছর বয়স, অথচ আজ পর্যন্ত কোন মেয়েকে লেখা এটাই আমার প্রথম চিঠি। এর আগে যে আমি কখনো চিঠি পাইনি তা না। এটা কোন মেয়ে থেকে পাওয়া আমার চতুর্থ চিঠি। স্কুলে পড়ার সময়ে আমাদের দোতালার মেয়ে টা আমাকে একটি চিঠি দিয়েছিল, কলেজে পড়ার সময় আমাদের উল্টো দিকের বাড়ির মেয়েটাও আমাকে একটা চিঠি দিয়েছিল। এই ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন টা দেয়ার পরে দেশের থেকে আমাকে একটি মেয়ে চিঠি দেয়। কোনটারই উত্তর দেয়া হয়নি। তবে তোমার টা দিচ্ছি। কারণ তোমার ভাষা এত সুন্দর। তুমি কি অনেক গল্পের বই পড়ো? আজ এ পর্যন্তই। তোমার চিঠির অপেক্ষায় অপেক্ষারত
রাজিব
(৭)
সুপ্রিয় রাজিব,
তুমি ঠিকই ধরেছো। গল্পের বই আমার একমাত্র নেশা। সেদিন কি হয়েছে তোমাকে না বললে বিশ্বাস করবে না। শীর্ষেন্দুর দূরবীন বইটা আমি পরীক্ষার আগের রাতে বসে পড়া শুরু করলাম। আসলে মূল চরিত্রের মধ্যে কেমন যেন একটা নেশা আছে, যে কোন মেয়ে ওর প্রেমে পড়তে বাধ্য। ভালো কথা ,সব মেয়ে তোমাকে এতো চিঠি দেয় কেন? তুমি কি দেখতে খুব সুন্দর? আমার আবার সুন্দর ছেলেতে আলার্জি আছে। অধিকাংশ ছেলেই মাকাল ফল হয়। তুমি একটা কাজ করবে তো। আমার চিঠি পাওয়া মাত্র কিছু ছবি আমাকে পাঠাবে। দেখি তোমার সাথে বন্ধুত্বটা কন্টিনিউ করতে পারি কিনা? আজকের মত এখানেই শেষ করি। দেখেছো আমি কতো লক্ষ্মী মেয়ে, তোমার কথা মতো তোমাকে তুমি বলতে শুরু করে দিয়েছি! ভালো থেকো। আবারো তোমার চিঠির এবং ছবির অপেক্ষায় অপেক্ষারত,
সুমি।
(৮)
প্রিয় সুমি,
তুমি চিন্তাই করবে না। সুন্দর হবার জন্য বাদ পড়ার কোন সুযোগই আমার নেই। আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন আমার বড় বোনের বিয়ের কথাবার্তা হলে, আমার ছেলে পক্ষের সামনে যাওয়া নিষেধ ছিল। আমার মায়ের ধারণা ছিল আমাকে দেখলে ছেলে পক্ষ ভরকে যাবে।তখন আমার প্রায়ই মনে হতো বড় হয়ে যখন আমার নিজের বিয়ের কথাবার্তা হবে, তখন আম্মা কি করবে? আমাকে তো তখন মেয়ে পক্ষের সামনে যেতে দিতেই হবে? যাক এখন আমি নিশ্চিন্ত।এমন একটা মেয়ের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে যে সুন্দর ছেলের ব্যাপারে আগ্রহী না।তোমাকে এত কথা বলছি এই জন্য যেন তুমি বুঝতে পারো আমার মনের মধ্যে তোমার অবস্থান কোথায়?আমার কেন যেন মনে হচ্ছে আমি বোধহয় একটু একটু করে তোমার প্রেমে পড়ে যাচ্ছি। কেন হচ্ছে সেটা তোমায় বলি। তুমি তো অনেক গল্পের বই পড়ো। তুমি কি কখনো আলেকজান্ডার পুশকিন এর কোন বই পড়েছ? ভদ্রলোকের অদ্ভুত কল্পনা শক্তি ছিল। তিনি তাঁর বাড়ির আঙিনায় একটি কাল্পনিক গাছ দেখতে পেতেন। আমারও গতকাল বিকেলে ঠিক তেমনটি হয়েছে। আমাদের শহরের পাশেই রয়েছে আর্গাইল বলে একটি ছোট্ট সুন্দর শহর। মাঝে মাঝে কাজের শেষে মন খারাপ লাগলে আমি সে শহরের বুক চিরে যে লম্বা রাস্তাটা চলে গেছে, হাইওয়ে 377, তা ধরে সোজা লং ড্রাইভে চলে যাই। রাস্তাটার সমান্তরালে একটি রেললাইন রয়েছে। কাল ঠিক সন্ধ্যার আগে আগে সূর্য ডোবার মুহূর্তে, আমি গাড়ি চালাচ্ছিলাম। তুমি আমার ছবি চেয়েছিলে, এই চিঠির সাথে একটি ছবি পাবে যেখানে আমি একটি কুকুর কোলে নিয়ে একটি লাল গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি। কুকুরটা ধার করা, তবে গাড়িটা আমার নিজের। গাড়িটার আমি একটা নাম দিয়েছি ,মুক্তি।মাঝে মাঝে মন খারাপের সময় আমি এই মুক্তিকে নিয়ে চলে যাই নিরুদ্দেশের পানে। কালকে বিকেলের কনে দেখা আলোয় আমি যখন ড্রাইভ করছিলাম, সামনে কমলা রং এর সূর্যটা ডুবি ডুবি করছে, কী এক অদ্ভুত সুন্দর নরম আলো ছড়াচ্ছে,ডান দিকে সমান্তরাল রেললাইনে ঝিক ঝিক করে মৃদু মন্থর গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে একটি মেইল ট্রেন। আমার সেদিকে তাকিয়ে হঠাৎ করেই মনে হল যেন তুমি আমার পাশের ডানদিকের প্যাসেঞ্জারের সিটটিতে বসে আছো।তোমাকে কি বলেছি এই দেশের গাড়িতে স্টিয়ারিং হুইলটা বাম দিকে থাকে? আচ্ছা তোমার কি হঠাৎ হঠাৎ করে আমার কথা মনে পড়ে, আজকাল? খুব জানতে ইচ্ছা করে। আর কি ইচ্ছা করে জানো? খুব তোমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করে। তোমাদের হোস্টেলে ছাত্রীদের ব্যবহারের জন্য কি কোন ফোন আছে? আমাকে কি সেই ফোন নাম্বারটা দেয়া যায়? আজ এটুকুই, ভালো থাকবে। ইতি,
তোমারই রাজিব
(৯)
প্রিয় রাজিব,
তুমি এমন পাগল কেন বলতো? তুমি যে একটু অস্থির প্রকৃতির তা অবশ্য তোমার চিঠি পড়ে বুঝতে পেরেছি। আচ্ছা ভালো কথা, তোমার জন্মদিন কবে? আমার রাশি চক্রে কিঞ্চিৎ আগ্রহ রয়েছে। তোমার জন্ম তারিখ জানতে পারলে মিলিয়ে দেখব তোমার রাশির সব লোকেরা এমন পাগল হয় কিনা? তুমি আমার ফোন নাম্বার চেয়েছ। একটা হোস্টেলে কত মেয়ে থাকে তোমার ধারণা আছে? তবে আসন্ন কোরবানির ঈদে আমি বাড়ি যাবো।চাইলে আমাদের ঢাকার বাড়ির ফোন নাম্বার তোমাকে দিতে পারি, কিন্তু দেবো না। আমার বাবা যে কি কঠিন প্রকৃতির একটা মানুষ, তুমি চিন্তাই করতে পারবে না।বিদেশ থেকে একটা ছেলে আমাকে ফোন করেছে এটা জানতে পারলে উনি যে আমার কি অবস্থা করবেন? তুমি না আমার বন্ধু ,তুমি না আমার ভাল চাও? জিদ করবে না, লক্ষ্মীটি। আমার বাবা আমার সব ব্যাপারে নাক গলান। ছোট্ট একটা উদাহরণ দিলে তুমি ব্যাপারটা বুঝতে পারবে। সব মেয়ে মাথার মাঝখানে সিঁথি করে। আমার কেন যেন তা ভালো লাগে না। তাই আমি ডান দিকে সিঁথি করি। এটা নিয়েও আমার বাবার আপত্তি। আমি নাকি বেশি ফ্যাশন করি। যাক বাবার কথা বাদ দাও। তোমার কথায় ফিরি। তুমি আমাকে এমন বিভ্রান্ত করলে কেন বলতো? তুমি বলেছ তুমি নাকি দেখতে সুন্দর না। আমি তোমার ছবিটার দিকে তাকিয়ে পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম। আমার তোমাকে খুবই হ্যান্ডসাম লেগেছে। তাও আমি শিওর হবার জন্য ভাবিকে ছবিটা দেখালাম।গত সপ্তাহে হঠাৎ করে আমার এক চাচাতো বোনের বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছিল। ওরা চাঁদপুর থাকে।তার একমাত্র ভাতিজির বিয়েতে আমি উপস্থিত থাকবো না এটা বাবা কখনোই হতে দেবেন না। তাই আমাকে চট্টগ্রাম থেকে চাঁদপুর যেতে হয়েছিল। আমার পরিবারের সবাই এসেছিল ঢাকা থেকে। আমি সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম কখন একটু ফাঁকা পাবো। ভাগ্যক্রমে রাতে আমি আর ভাবি একসাথে ঘুমালাম। ভাবি তোমার ছবি দেখা মাত্র শোয়া থেকে উঠে বসলো। তখনই বুঝলাম আমার ধারনাই ঠিক। আমি সুন্দর ছেলে পছন্দ করি না বলেছিলাম, কথাটা আসলে ঠিক না। মনে মনে আমরা সবাই সুন্দরের পূজারী। টেলিফোন নাম্বার দেইনি, কিন্তু ক্ষতিপূরণ হিসেবে মন তো ভালো করে দিলাম? নাকি বাবুর এখনো মন খারাপ ?
ইতি
তোমার সুমি
(১০)

আমার সুমি,
আমি খুবই আশা করেছিলাম যে তুমি আমাকে তোমার ফোন নাম্বার পাঠাবে। তুমি তা করোনি। কিন্তু তুমি আমার জন্ম তারিখ জানতে চেয়েছ। আমি ঠিক করেছি আমিও তা তোমাকে জানাবো না। তবে তোমাকে একটু হিন্টস দিতে পারি। সবার জন্মদিন আসে বছরে একবার, কিন্তু আমার জন্মদিন আসে প্রতি ৪ বছরে একবার।বলতো আমার জন্মদিন কবে? যদি বের করতে পারো, তবে তোমার একটা ছবির পিছনে আমার জন্ম তারিখটা লিখে আমাকে পাঠাবে। আমি ভেবেছিলাম তোমার ছবি চাইবো না, কিন্তু যেহেতু তুমি তোমার ফোন নাম্বার আমাকে পাঠাও নি, তাই জরিমানা হিসাবে ছবিটা চাইলাম। আজকে মাসের প্রথম দিন। আমি দু সপ্তাহ অপেক্ষা করব। একটা চিঠি দেশে যেতে সাত দিন লাগে। দেশ থেকে আসতেও সাত দিন লাগে। যদি ১৫ তারিখের মধ্যে তোমার উত্তর না পাই, তাহলে আমি কি করবো তোমাকে বলি। তুমি আমাকে পাগল বলেছো, তখন বুঝবে সত্যিকার পাগল কি জিনিস। আমি আমার অফিসে দুই সপ্তাহের নোটিশ দেবো ছুটির দরখাস্ত করে।তারপর এ মাসের শেষে দেশে যাব। আমি যা চাই তার জন্য ১৪ হাজার মাইল কোন দূরত্বই না। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা বুঝতে পারবে।ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর আমি কম্পিউটার সাইন্স পড়তে চেয়েছিলাম। তখন দেশে একমাত্র বুয়েটে ৩০ জন ছাত্র তা পড়তে পারতো।তার মধ্যে একটি সিট আবার উপজাতীয় ছাত্রদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।আমি যখন বুঝতে পারলাম২৯ জন ছাত্রের মধ্যে আমি স্থান করে নিতে পারব না,তখন আমি চোদ্দ হাজার মাইল দূরত্ব পাড়ি দিয়ে আমার ইচ্ছা পূরণ করি। এত কথা বললাম এই জন্য যাতে তুমি বুঝতে পারো, আমি যদি কিছু চাই তার জন্য দূরত্ব আমার কাছে কোন ব্যাপারই না। আমি তোমাকে চাই। সুতরাং আমি আগামী মাসের প্রথমেই তোমার কলেজে হাজির হব। তুমি যদি তখন আমাকে প্রত্যাখ্যান করো, তখন আমি পার্শ্ববর্তী কে বি ফজলুল কাদের রোড ধরে পাঁচলাইশ থানায় গিয়ে হাজির হব এবং তার ওসিকে বলবো চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের একটি মেয়ে আমার হৃদয় চুরি করেছে। আপনি জিডি এন্ট্রি করেন। তুমি হয়তো ভাবছো আমি মজা করছি, আমি কিন্তু সত্যি সত্যি তাই করবো। এখন তুমি ঠিক করো তুমি কি এই ঝুঁকি নিবে ,কিনা ? ইতি,
তোমারই রাজিব।
(১১)
চিঠিটা হাতে পেয়ে সুমি থতমত খেয়ে গেল।রাজীবকে ও পাগল ভেবেছিল কিন্তু ও যে সত্যিই এতটা পাগল তা ওর ধারণার বাইরে ছিল। সুমির কাছে কোনো ছবি নেই। ছবি তুলতে যে স্টুডিওতে যাবে সে সময়টাও ওর হাতে নেই। আসন্ন থার্ড প্রফ পরীক্ষা ওকে এতটাই ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছে। কোথা দিয়ে যে মাসটা পার হয়ে গেল ও টেরই পাইনি। থার্ড প্রফ এর পরীক্ষা যেদিন শেষ হলো, সেদিন ও প্রথম যে কাজটি করলো তা হল, ছবি তুলতে নিকটস্থ স্টুডিওতে গেল। তারা ছবি ডেলিভারি দিতেও প্রায় দিন দু এক দেরি করে ফেলল।ততদিনে রাজিব ঢাকা হয়ে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে পৌঁছে গেছে।সেখানে ওর এক দুঃসম্পর্কের দুলাভাই চাকরি করেন।তার বাসায় রাতটা কাটিয়ে পরদিন সকালে সে চিটাগাং মেডিকেল কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।দুলাভাই তাকে খুবই যত্ন-আত্তি করলেন। এমনকি অফিসের ফাঁকে তাকে চট্টগ্রামের বাসে তুলে দিয়ে ভাড়া টা পর্যন্ত দিয়ে দিলেন। ভাগ্যিস দিয়েছিলেন ,না হলে কি যে এক বিপত্তি ঘটতো।
(১২)
রাজিব যখন ঘুমিয়ে ছিল তখন তার সাথে একটি অন্যায় ঘটে যায়।কে যেন তার মানিব্যাগ থেকে সব বাংলাদেশী টাকা সরিয়ে রাখে। সেখানে ডলারও ছিল। যে টাকাটা সরিয়েছে সে সম্ভবত ডলার চিনে নাই, কিংবা ডলার ভাঙ্গানোর উপায় তার জানা নেই।
চট্টগ্রাম শহরে বাস থেকে নেমে সে যখন রিকশাওয়ালাকে নিউ লেডিস হোস্টেলের কথা বলল, লোকটি জায়গাটা ঠিক চিনতে পারছিল না। স্থানীয়দের কাছে নিউ লেডিস হোস্টেলের নাম কান্তা ছাত্রী নিবাস। অনেক ঝামেলা করে রাজিব যখন সেখানে পৌঁছালো তখন ঠিক মধ্য দুপুর। ভাড়া মেটাতে গিয়ে রাজিব এই প্রথমবার আবিষ্কার করল যে তার কাছে কোন দেশী টাকা নেই। সে তখনই রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করল মেডিকেল কলেজে কোন ব্যাংক আছে নাকি? রিক্সাওয়ালা তাকে মেডিকেল কলেজের লবিতে নিয়ে গেল। সেখানেই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ব্যাংক এবং পোস্ট অফিস।
(১৩)
অত্যন্ত বুদ্ধিমান যারা তাদের একটা সমস্যা হলো, যেকোনো কিছু নিয়ে তারা খুব জটিল ভাবে ভাবতে শুরু করে। রাজিব এর জন্মদিন কেন চার বছরে একবার করে আসে,এটা নিয়ে অতিরিক্ত ভাবাভাবিতে সুমি ব্যাপারটিকে জটিল করে তুলল।তবে আজ সকালে গোসলের সময় হঠাৎ করেই ব্যাপারটা তার মাথায় পরিষ্কার হয়ে গেল। রাজিব এর জন্ম হয়েছিল লিপ ইয়ারে, জন্ম তারিখ ২৯ শে ফেব্রুয়ারি। আজ সকালে ডেলিভারি পাওয়া ছবির পিছনে ও যখন এই তথ্যটা লিখছিল পোস্ট অফিসে দাঁড়িয়ে, তখন পার্শ্ববর্তী ব্যাংকে হঠাৎ করে একটু বচসার শব্দ শুনতে পায়। তাকিয়ে দেখে লম্বা মত একটি ছেলে খুবই অসন্তোষ প্রকাশ করছে, তার ভাঙ্গানো ডলারের রেট দেখে। হালকা যা ওর কানে আসলো ,তার থেকে ও যা বুঝতে পারল তা হচ্ছে, প্রবাসী এই ভদ্রলোককে ১০০ ডলার ভাঙানোর জন্য এক রকম রেট দেয়া হয়েছে আর খুচরো ডলার ভাঙানোর জন্য তার চাইতে কম রেট দেয়া হয়েছে। তিনি ইংরেজিতে বলে চলেছেন “ইটস নট ফেয়ার।”
(১৪)

প্রবাসীদের একটা বড় সমস্যা হল এরা দেশে ফিরলে খুবই চেষ্টা করে বাংলায় কথা বলবার, কিন্তু একটু বিরক্ত হলেই ইংরেজিতে কথা বলা শুরু করে। রাজিবও এর ব্যতিক্রম নয়। ওর উচ্চ স্বর এর ইংরেজি কথা শুনে , সেদিকে তাকিয়ে সুমি একদম তাজ্জব বনে গেল। রাজিব অবশ্য বলেছিল চিঠি না পেলে এক মাসের মধ্যে সে এসে হাজির হবে, কিন্তু সে যে সত্যি সত্যি তা করবে এটা সুমির ধারণার বাইরে ছিল। ঘটনার আকস্মিকতায় ও তাজ্জব বনে গেল।
(১৫)
সুমি যখন সম্বিত ফিরে পেল,ততক্ষণে রাজিব তার লম্বা লম্বা পা ফেলে রিক্সার দিকে রওনা দিয়েছে।মেডিকেল কলেজের লবিতে ফুটফরমাশ খাটে যে ছেলেটা তার নাম টগর। এই ছেলেটির বাড়ি চান্দিনা, সুমিদের গ্রামের বাড়ির খুব কাছে। আর তাই ছেলেটির সাথে সুমীর বিশেষ সখ্যতা রয়েছে। সে ছেলেটির হাতে একটি চিরকুট দিয়ে বলল তাড়াতাড়ি স্যারকে গিয়ে দিবি, আর কে দিয়েছে, জিজ্ঞেস করলে আমাকে দেখাবি না।
(১৬)
টগর যখন রাজিবের কাছে পৌছালো, ততক্ষণে রাজীবের রিক্সা টি চলতে শুরু করে দিয়েছে।টগর পিছনের পাদানিতে উঠে হুডের এর মাঝখানে যে ছোট্ট একটি জানালার মত থাকে, সেই ফাঁক দিয়ে হাত গলিয়ে চিরকুটটি রাজীবকে দিল। রাজিব ছোট্ট কাগজের টুকরোটা হাতে নিয়ে দেখে সেখানে লেখা রয়েছে,”তুমি জানতে চেয়েছিলে তোমার জন্মদিন কবে, আহ্নিক গতি, বার্ষিক গতি পড়েছি বহু বছর আগে, এতদিন পরে সেই পরীক্ষা নেয়া কি ঠিক? তবু আমি ভেবেচিন্তে দেখলাম, যেহেতু তোমার জন্মদিন আসে প্রতি চার বছরে, তুমি জন্মেছ লিপ ইয়ারের বোনাস দিনটিতে। এখন দেখি তোমার বুদ্ধি কেমন,তুমি কি লবির এত মেয়ের মাঝে আমাকে খুঁজে বের করতে পারবে?”
(১৭)
ইটটি ছুড়লে নাকি পাটকেলটি খেতে হয়। ছেলেটি কে অনেক জিজ্ঞেস করেও যখন উত্তর পাওয়া গেল না কে ছবিটি রাজিব কে দিয়েছে, তখন ওর আর বুঝতে বাকি রইল না, সুমিও ওর সাথে মজা করছে।ওর জন্মদিন নিয়ে ধাঁধা করার শাস্তি এটি।
রাজিব লক্ষ্য করে দেখলো যদিও লবিতে অনেক মেয়ে রয়েছে, তবে একটি মাত্র মেয়ের চুল ডানদিকে সিঁথি করে আঁচড়ানো। মেয়েটির পরনে একটি সাদা এপ্রোন আর গলায় ঝুলছে স্টেথোস্কোপ।বাংলাদেশের যে দ্রুততম মানব অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করেছিলেন তার নাম সাইদুর রহমান ডন। অলিম্পিকের সেই হিটে তিনি কত দ্রুত দৌড়িয়েছিলেন আমি তা জানি না,তবে আমার ধারণা তার চাইতে দ্রুত গতিতে রাজিব সুমির কাছে গিয়ে ওকে হাঁটুর পিছনে ধরে উঁচু করে তুলে পাক খেতে শুরু করলো।পোশাকি ছবিতে নর্তকীর ঘাগড়া যেভাবে বাতাসে ফুলে ফুলে উঠে,সুমির এপ্রনটিও ঘূর্ণির কারণে তেমনি ফুলে ফুলে উঠছিলো। সুমির প্রিয় লেখক কে তা আপনাদের বলেছি, এখন আপনাদের ওর প্রিয় কবির নাম বলি। ওর প্রিয় কবির নাম নির্মলেন্দু গুন। উনি একটি কবিতা লিখেছিলেন, যার দুটো লাইন ছিল এরকম,
“হে পৃথিবী তুমি দ্বিধা হও, আমি তোমার ভেতর প্রবেশ করে বাঁচি!”রাজিবের এ অসভ্য আচরণে ওর কাঁধে মাথা গুঁজে এই লাইন দুটোই বারবার মনে পড়ছিল সুমির।

লেখাঃশাহাদুল ইসলাম 
ডালাস, টেক্সাস, ইউএসএ।

Facebook Comments

About Priyo Golpo

Check Also

হুইসেল-whistle-abdul-zabbar-khan-jiboner-golpo

হুইসেল । Whistle

বিকেল পাঁচটার দিকে ঢাকা ইউনিভার্সিটি টিএসসি’র সামনে থেকে একটা রিকশা নিলাম। প্যাসেঞ্জার সুমি এবং আমি। …

error: Content is protected !!