Home / গল্প / বল্টু সমাচার
Bangla Best golpo Boltu k niya - Boltu is Rocks

বল্টু সমাচার

শপিং মল থেকে উচ্ছসিত মুখে বেরিয়ে এলো ওরা। মেয়েটা হাসিমুখে হাঁটতে হাঁটতে তার ওড়না সামলাতে ব্যস্ত। বেশ কয়েকটা শপিং ব্যাগ হাতে একটু পেছনে পড়ে গেছে ছেলেটা। মেয়েটাকে একটু দাঁড়াতে অনুরোধ করলো।
গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,
: জরিনা, দেখো, অদ্ভুত সুন্দর একটা ওয়েদার! আকাশটা কেমন ভেজা ভেজা। বাতাসটাও খুব মজার। 
অনেকদিন ধরে তোমাকে একটা কথা বলবো ভাবছি……।
জরিনার চুল বাতাসের তোড়ে উড়ে যাচ্ছে।
সামলে নিয়ে বললো,
: বল্টু ভাই, আজকে না…একটু তাড়া আছে।
আরেকদিন বইলেন। দেরি হলে মা বকা দেবে। বলে হাত বাড়িয়ে শপিং ব্যাগগুলো নিজের হাতে নিয়ে নিলো জরিনা। রিকশা ডাকছে ইশারায়।
বল্টু ভাই থমকে গেল। আর কোন কথা জোগাচ্ছে না মুখে।

জরিনাদের ডিগবাজিতে এভাবেই বল্টুভাইদের কতো কথা কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে, কে জানে! আহা…!

:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ভবনের সামনে একটা গাছের তলায় প্রায় পঁচিশ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে আছে বল্টু। ভেতরের রাগ আর সুর্যের প্রখর তাপে মনে হচ্ছে ব্রেইন গলে বেরিয়ে যাচ্ছে। ওপরের দিকে তাকিয়ে একটু দেখলো। গাছের একটা পাতাও নেই। সিজন চেন্জ হচ্ছে বোধহয়। কয়েকবার ওপরের দিকে দৃষ্টি দেবার কারনেই হয়তো, সবকিছু এখন ঘোলা ঘোলা লাগছে।
কেয়ামতের ময়দানে এই সুর্য মাথার এক হাত উপরে নেমে আসার কথা। তখন কি অবস্থা হবে কে জানে!

ঠিক সাড়ে এগারোটায় দেখা করার কথা। বারোটা প্রায় বাজে। অথচ জরিনার খবর নেই। কড়া পারফিউম দেয়া নীল রঙের ফুলস্লিভ শার্ট টা ঘামে ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে গেছে। অন্যেরা পাবে কি করে! নিজেই এখন পারফিউমের কোন গন্ধ পাচ্ছে না। শরীর জুড়ে চটচটা ঘামের গন্ধ। মোবাইলে কয়েকবার কল দিয়েও পাওয়া গেল না। রিং হয়। ধরে না। হয়তো এসে বলবে,
: ভাইয়া…ফোন তো ব্যাগের ভেতর ছিলো।
গাড়িঘোড়ার সাউন্ডে টের পাইনি।
এভাবে গাছতলায় দেখা করার ব্যাপারে একটা ফাইনাল ডিসিশন নেয়া দরকার।
প্রয়োজনে গুগল দেখে সিজন কনফার্ম হয়ে নিতে হবে। প্রখর রোদ আর গাছের পাতার ব্যাপার টা মাথায় রাখতে হবে। মেজাজটা আস্তে আস্তে খিঁচড়ে যাচ্ছে। গতকাল ফোনে যখন বললো,
: একটা রিকশা নিয়ে আমার বাসায় চলে আসো! তারপর নাহয় দুজনে মিলে বইমেলায় যাবো।
জরিনা ইনিয়ে বিনিয়ে বললো,
: ভাইয়া…. এভাবে হুট করে আপনার বাসায় যাওয়া কি ঠিক হবে! আম্মু টের পেলে খবর করে ছেড়ে দেবে! তারচেয়ে আপনি চারুকলার সামনে চলে আসেন। একসাথে বইমেলায় ঢুকে যাবো। আপনার টাইম বেঁচে যাবে।
শুনে বল্টুর মাথা নষ্ট। মনে মনে বললো,
: ওরে হারামজাদি… বইমেলায়, শপিং মলে ঘোরাঘুরির সময় তোর মায়ের কথা মনে থাকে না! বাসায় আসতে বললেই সব সমস্যা! আর আমার টাইম নিয়ে তোর এতো মাথাব্যথা!
মুখে খুব শান্ত গলায় বললো,
: দেখো জরিনা, আমিতো আর তোমাদের মতো স্টুডেন্ট না। চাকরি বাকরি করি। এভাবে রাস্তাঘাটে দাঁড়িয়ে থাকতে খারাপ লাগে।
তাই বললাম। আমার কথায় তুমি কিছু মনে করো না!
জরিনা শান্তনা দেবার ভঙ্গিতে বললো,
: না না ভাইয়া। মনে করার কি আছে! ভাইয়ের বাসায় বোন কি যেতে পারে না!
কোন একদিন নিশ্চয়ই যাবো!
বল্টুর মেজাজ খুব খারাপ হয়ে গেল। ভাবলো,
: আমি তোর কোন জন্মের ভাইরে! এবার খালি দেখা কর! একটা ফয়সালা না করে ছাড়বো না। দেখি, ফয়সালা না করে তুই বইমেলায় যাস কি করে!

একটা রিকশায় করে তিনটা ছেলে এসে নামলো। লিডার গোছের একজন বল্টুর দিকে তাকিয়ে বললো,
: কি ব্রাদার, খুব তো মজা মারছেন! আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটাকে পটিয়ে ফেলেছেন। আমাদের তো কোন খবর টবর নিলেন না। নামে বল্টু, সাইজেওতো বল্টু। কি কায়দায় পটালেন? একটু ঝেড়ে কাশেন তো!
ভয়ে পাঁচ ফিট পাঁচ ইঞ্চি বল্টুর গলা শুকিয়ে গেল। আমতা আমতা করে বললো,
: ইয়ে…মানে দেখুন, জরিনা কিন্তু আমার ছোট বোনের মতো। আপনি যেরকমটা ভাবছেন, ওরকম কিছু নয়।
লিডার টা কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
জরিনা একটা রিকশা থেকে নামছে। চড়া কন্ঠে লিডারটার দিকে তাকিয়ে বললো,
: খালি খালি ঝামেলা খুঁজে বেড়াও! শুনলাইতো সব। ভাইয়া খুবই ভালো একজন মানুষ। অযথা বিরক্ত করো না!
ছেলেগুলো ‘স্যরি’ বলে মুচকি হেসে চলে গেল।

নীল সালোয়ারের সাথে সাদা টপস পরা জরিনাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে। ওর দিকে তাকিয়ে বল্টু একটা বড়সড় ঢোঁক গিলে ফেলল। কতো কিছু বলবে বলে ভেবে রেখেছিলো। কিছুই বলা হলো না। মেলাপ্রাঙ্গনের দিকে ইশারা দিয়ে বললো,
: চলো…. .যাই…!

জরিনাদের মোহে পড়ে এভাবেই বল্টুভাইদের কতো কথা কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে, কে জানে! আহা…!

ফজরের নামাজ পড়ে সালাম ফিরিয়ে জায়নামাজেই বেশ কিছুক্ষণ ধরে বসে আছে বল্টু। মন ভীষণ খারাপ।
গতকাল সন্ধ্যায় ধানমন্ডি লেকের পাড়ে দীর্ঘ সময় ধরে একাই বসে ছিল। কথা দিয়েও জরিনা আসেনি। পাশ দিয়ে কতো কাপল হেঁটে গেল। চেয়ে চেয়ে দেখা আর দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া কিছুই করার ছিল না। শুধু ভয়ংকর একদল মশা সঙ্গ দিয়েছে। কামড়ে কামড়ে শরীর ফুলে ঢোল।
রাতে বাসায় ফিরে ভাতটা পর্যন্ত খেতে ইচ্ছে করেনি। মানসিক ক্লান্তিতে একসময় ঘুমিয়ে পড়েছে।
ফজরের আজান শুনে ঘুম ভেঙ্গে গেছে। ভাবলো, এই অবস্থায় নিজেকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে দেয়াই উত্তম। ওইসব জরিনা ফরিনা দিয়ে জীবন চলবে না। অনেক তো দেখা হলো! আর কতো! বরং বেগানা একটা নারীর সঙ্গে মেলামেশা করে পাপের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। এটা থেকে মুক্ত হতে হবে। আজ থেকে এসব একেবারেই বন্ধ।
ফাইনাল ডিসিশন নিয়ে মুনাজাতে গেল।

অফিসে লাঞ্চ ব্রেকের সময় সেলফোনে জরিনার নাম ভেসে উঠলো। একবার ভাবলো আর কখনোই ওর ফোন রিসিভ করবে না।
তারপর ভাবলো, জরিনাকে ফাইনাল ডিসিশনটা জানিয়ে দেয়া দরকার। যতো সুন্দরীই হোক, তাকেও যে কোন পুরুষ রিফিউজ করতে পারে, এটা অন্তত প্রমাণ হোক।
ফোনটা ধরে গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
: হ্যাঁ, তাড়াতাড়ি বলো! আমি এখন খুবই ব্যস্ত। লম্বা কথা বলার সময় নেই।
জরিনা বললো,
: কোন সমস্যা নেই। গতকাল খুব মাথা ধরেছিল। তাই আসতে পারিনি। আপনার সাথে খুবই ইম্পর্ট্যান্ট কিছু কথা আছে।
সন্ধ্যায় ধানমন্ডি লেকপাড়ের ঐ জায়গাটায় থাকবো। বাই! বলেই লাইনটা কেটে দিল।
প্রচন্ড রাগে বল্টুর ভেতরটা চিড়বিড় করে উঠলো।
: বেয়াদব মেয়ে! মহারানী আসছে! হুকুম দিলা, আর চলে গেলাম! সেইদিন আর নাই। বসে থাক্ গিয়ে ওই লেকের পাড়ে! তওবা করে ফেলেছি। এইসব পাপ কাজে আমি আর নাই। একা একা বসে মশার কামড় খা!
ভাবতে ভাবতে বল্টু সন্তুষ্ট চিত্তে ক্যান্টিনের দিকে এগিয়ে গেল। ফার্স্ট ক্লাস একটা লাঞ্চ করতে হবে। ক্ষিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে।

রাত প্রায় আটটা হয়ে গেল। অফিসের পর বল্টু আর এক মূহুর্ত দেরি করেনি। সাড়ে ছয়টার মধ্যেই ধানমন্ডি লেকে হাজির। কথাগুলো সামনাসামনি বলা দরকার।
ফাইনাল ডিসিশন বলে কথা!
জরিনার খবর নেই। অন্তত পঞ্চাশ বার কল দেয়া হয়ে গেছে। রিং হয়। ধরে না।
এটা নতুন কিছু নয়।
যখনই কোন প্রোগ্রাম ফেইল করে, জরিনা আর ফোন রিসিভ করে না। অথচ কতো কথাই না বলার ছিলো। হাহ্….!
মশাগুলো ক্লান্তিহীন ভাবে কামড়ে চলেছে।

জরিনাদের অবহেলায় এভাবেই বল্টুভাইদের কতো কথা কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে, কে জানে! আহা…!

লেখাঃ আবদুল জাববার খান

Facebook Comments

About Priyo Golpo

Check Also

মানুষ রা যে বড় বেশী স্বার্থপর

আর কত পথ চল্ লে, ওই নীল সাগরের অসীম জলরাশি ছুঁতে পারব আমি? নীল সাগরের …

error: Content is protected !!