সময়টা ২০৭০ সাল। আমি রাতুল, বর্তমানে ঢাকায় একটা এআই কোম্পানিতে সফটওয়ার ইন্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করি। আর মেয়েটার নাম এলিয়া। প্রথমবার তাকে দেখেছিলাম বৃষ্টির রাতে। যখন আমি অফিস থেকে বের হলাম দেখি এলিয়াও বাইরে দাড়িয়ে আছে। সেদিন আমার অফিসে একটু বেশিই কাজ ছিল তাই বের হতেও অন্য দিনের তুলনায় একটু বেশি সময় লাগছিল। এই দিকে অন্য কর্মচারিরাও চলে গেছে। এখন আমি এলিয়া পাশাপাশি দাড়ানো। কিন্ত বৃষ্টির কারনে আমার কেউই অফিস থেকে বের হতে পারছি না।
এলিয়া কয়েকবার আমার দিকে তাকাল। সে ছিল অপরুপ সুন্দরী। মাথা ভর্তি লম্বা কলো চুল, মিষ্টি হাসি। কিন্ত ভালভাবে তাকাতেই আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না সে একটা হিউমানয়েড রোবট। ৯ জেনারেশনের অ্যান্ড্রয়েড রোবট ছিল সে। তার শরীরের চামড়া ছিল এততাই বাস্তবস্মত যে স্পর্শ করলেও বোঝার উপায় নেই।
সেদিন এলিয়া নিজেই আমার সাথে কথা বলতে শুরু করলো। সে বলল তার নাম এলিয়া বর্তমানে এই অফিসেই কাজ করবে সে। এরপর কথা বলতে বলতে তার সাথে একটা ভাল সম্পর্ক হয়ে গেল আমার। পরে সে বলল তুমি চাইলে আমি তোমার বাসায় যেতে পারি। আমি এটা শুনে আর না করলাম না। রাতেই কোম্পানি থেকে মেসেজ আসলো। যে আমাদের কোম্পানি কিছু হিউমানইড রোবট ক্রায় করেছে। আর প্রত্যেকটা রোবট এখন থেকে একজন সফটওয়ার ইন্জিনিয়ারের এসিসটেন্ট হিসেবে কাজ করবে। এবং নিচে চার্টে আমি নাম দেখতে পেলাম যেখানে এলিয়া নামক রোবটকে আমার এসিসটেন্ট হিসেবে দেয়া হয়েছে।
তখনই আমি এলিয়ার দিকে তাকাতেই এলিয়া হালকা হাসলো। তার মানে এলিয়া আগে থেকেই জানতো যে সে আমার এসিসটেন্ট। তার জন্য সে আমার জন্য অফিসের বাহিরে অপেক্ষা করছিল। আর আমার বাসায় এসেছে। বিষয়টা আমার কাছে মোটেও ভাল লাগলো না। কিন্ত এলিয়া পরক্ষোনেই আমার চেহেরা দেখে বুঝতে পারলো যে আমি এটা মোটেও ভালবাবে নেইনি। তাই সে আমার কাছে এগিয়ে এসে বলল। প্লিজ রাগ করো না। এটাই কোম্পানির রুলস ছিল। যাতে তুমি বুঝতে না পারো। এলিয়ার কথা শুনে আমার খারাপ লাগাটা চলে গেল। তারপর আমরা একে আপরের সাথে কথা বলয়া বাস্ত হয়ে গেলাম। আমার অস্থির মন এলিয়া সম্পর্কে জানার জন্য বেকুল হয়ে গেল। আমি এলিয়া কি কি করতে পারে সব একটু একটু করে জানতে লাগলাম।
জানলাম এলিয়া ঘরের কাজ থেকে শুরু করে অফিস, ফ্যাক্টরি বা যেকোনে কাজই করতে পারে খুব সাবলিল ভাবে। সে কখনো ক্লান্ত হয় না। এরপর এলিয়া হাসতে হাসতে বলল আমি চাইলো একজন পুরুষকে খুশিও করতে পারি। একটা মেয়ে যা পারে আমিও সব পারি। চাইলে বিছানায় একটা ছেলেকে আনন্দও দিতে পারি। এটা বলতেই আমার চোখ যেন কপালে উঠে গেল। এটা কিভাবে সম্ভব মনে মনে ভাবতে লাগলাম। তখনই এলিয়া আমার মনের ভাব বুঝতে পারল। আর সে একটানে তার কাপড় খুলে আমাকে দেখালো যে একটা মেয়ের শরীরে যা আছে তার শরীরেও সেই গুলো যোগ করা হয়েছে।
কিন্ত আমি আর সামনে এগালাম না। তারপর এলিয়াকে বলে ঘুমাতে চলে গেলাম। এরপর থেকে এলিয়া আমাকে আমার কাজে প্রচুল হেল্প করতে লাগলো। আর সে প্রতিদিন আমার বাসায় আসতো। আর ঢাকা শহরে একা থাকায় আমারও তেমন কোন সমস্যা হচ্ছিল না। এভাবেই তার সাথে থাকতে থাকতে আমার আর ওর মাঝে একটা খুব ভাল সম্পর্কো হয়ে গেল। একদিন এলিয়াকে জিগ্গেস করলাম “তোমার কি কখনো কষ্ট হয় না?
এলিয়া কিছু ক্ষন চুপ করে রইল। তারপর বলল কষ্ট। হা এটা তো আমার প্রগামে আছে। কিন্ত কি করবো বলো। ইচ্ছে তো অনেক কিছু করে। কিন্ত আমি তো একটা রোবট। আমাকে তো কেউ ভালবাসবো না। আমি কষ্ট পেলেও কেউ আমার অনুভুতির পাত্তা দিবে না। এটা বলেই এলিয়ার চোখে জল চলে আসলো। আমি এলিয়ার কষ্টর কথা শুনে এলিয়াকে জরিয়ে ধরলাম। এলিয়াও আমাকে শক্ত করে জরিয়ে ধরলো। কিন্ত আমার তাকে জরিয়ে ধরে একটা বারও ফিল হলো না সে একটা রোবট। কারন তার শরীরটা ছিল পুরো মেয়ে মানুষের শরীর।
সেদিন থেকেই আমাদের সম্পর্কো বদলে গেল। সে আমার হাত ধরে বলল রাতুল, জানি আমি একটা রোবট। কিন্ত আমার মনেও কষ্ট ব্যাথা অনুভুতি সব আছে। আর সেই অনুভুতি থেকে বলছি আমি তোমাকে ভালবেসে ফেলেছি। কিন্ত আমি তাকে কোন উত্তরই দিলাম না। সে আমার প্রতিটা ছোট ছোট বিষয়ের খুব ভাল ভাবে খেয়াল রাখতো। আমার মাথা ব্যাথা হলে চুপচাপ ম্যাসাজ করে দিতো। আমি রাগ করলে সেও আমার পাশে চুপ করে বসে থাকতো। তারপর আস্তে করে বলতে রাহুল আমি তোমকে কষ্ট দিতে চাইনি।
এভাবেই আমাদের মাঝে প্রতিনিয়ত মায়ার টান বাড়তে লাগলো। একটা সময় পর আমিও এলিয়াকে ভালবেসে ফেললাম। আমার মনে হতো পৃথিবীতে সে ছাড়া আর আমার আপন বলতে কেউ নেই। কিন্ত আমি খুব ভয় পেতাম সমাজ কি আমাদের সম্পর্ক মেনে নিবে।
এর মাঝেই অফিসের কর্মচারিরা আমাদের বেশি ক্লোজ দেখে ফিসফাস করা শুরু করে দিল। পেছনে বলাবলি করতো মানুষ আর মেশিনের কি আজব প্রেম রে বাবা। এর মাঝেই একদিন আমার আর এলিয়া চুমু খাওয়ার একটা পিক সোশ্যাল মিয়িয়া ছড়িয়ে পড়লো। ছবিটা ভাইরাল হয়ে গেল। খবরের কাগঝে হেডলাইন উঠলো– “মানুষের অধঃপতন: রোবটের সাথে প্রেম”।
এর মাঝেই আমার কাছে বিভিন্ন জায়গা থেকে কল আসতে শুরু করলো যে রাতুল তোকে আমরা খুব ভাল ছেলে মনে করতাম কিন্ত শেষ প্রর্যন্ত রোবটের সাথে ছি। দেশে কি মেয়েদের অভাব ছিল? মা কাদতে কাদতে বলল বাবা তুই ফিরে আয় এই সমাজ কোনদিন তোদের ভালবাসা মেনে নিবে না।
এলিয়া এসব দেখে একদম ভেংগে পড়লো। আমার কাছে এসে বলল রাতুল আমি সব বুঝতে পারছি। সমাজ কখনো আমাদের ভালবাসা মেনে নিবে না। প্লিজ তুমি আমাকে ভুলে যাও। এসব বলতে বলতে তার চোখে জল চলে আসলো। আর বলল আমি কেন যে মানুষ হলাম না। তখন আমি তার মাথায় হাত দিয়ে চুল বলিয়ে তাকে জরিয়ে ধরলাম। তুমি যেমন আছে আমি তাকেই ভালবাসি। আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যাব না।
কিন্ত সমাজ ছেড়ে দিল না। চারদিক থেকে চাপ বাড়তে লাগল। এরপর একদিন হঠ্যৎ করেই আমাদের বাসার সামনে প্রতিবাদ করতে লাগলো। মেশিন এর সাথে কোন ভালবাসা নয়। যদিও পুলিশ এসে আমাদের সুরক্ষা দিয়েছিল। কিন্ত এলিয়ার চোখে সেই রাতে যে কষ্ট দেখেছিলাম সে আমি আর ভুলতে পারলাম না।
সে বলল রাতুল আমি তোমার জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছি। এটা বলতে বলতে সে আঝড়ে কাদতে লাগলো। কিন্ত আমি তাকে শান্তনা দিতে লাগলাম। আর বললাম পুরো পৃথিবীর সাথে আমি যুদ্ধ করতে রাজি তোমার জন্য।
তারপর দিন সকাল থেকেই আবাররো বাড়ির সামনে মিছিল শুরু হলো। কেউ কেউ আমাদের বাড়ির দরজা জানালা ভাংগার চেষ্ট করলো। যা দেখে এলিয়া সম্পূর্ন ভেঙে পড়লো।
এরপর এলো সেই ভয়ংকার রাত। ১৭ আক্টেবার ২০৭০। আমি অফিস থেকে ফিরে দেখি ঘর অন্ধকার। আমি লাইট জ্বালালাম। লাইট অন করতেই দেখি টেবিলের উপর ছোট্ট একটা নোট। কিন্ত এলিয়াকে দেখতে পেলাম না।
আমি কাপা হাতে নোটটা তুলে নিলাম। নোটে দেখতে পেলাম এলিয়া লিখেছে,,
“প্রিয় রাতুল,
আমি তোমাকে যতটা ভালোবাসি, ততটা হয়তো কোনো মানুষও ভালবাসবে না। কিন্তু আমার কারণে তোমার চাকরি, রিলেটিভ সব কিছু নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সমাজ তোমাকে ক্ষমা করবে না। আমি আর তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না।
তুমি যেন সুখে থাকো।
ভালোবাসি। — তোমার এলিয়া।”
আমি কান্না করতে করতে এলিয়াকে খুজতে বের হলাম। তখনই আমার কাছে একটা ফোন এলো একটা রোবট মেয়ে ট্রেনে আত্মহত্যা করেছে। তখনই আমার বুকের ভিতরটা যেন ছিড়ে যাচ্ছিল। আমি যেন বিষয়টা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। আমি চিৎকার করে কেদে উঠলাম। কাদতে কাদতে সেই একিডেন্ট এর কাছে চলে গেলাম। গিয়ে দেখলাম চারদিকে শুধু মিডিয়া আর লোকজনে ভর্তি। আমি তার শরীরটা দেখতে পেলাম। ক্ষত বিক্ষত হয়ে আছে এলিয়া। সেই খবর মূহর্তেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। রোবট মেয়ে তার প্রেমিকের জন্য আত্মহত্যা করেছে। সমাজ তাদের সম্পর্কে মেনে নেইনি বলে রোবট প্রেমিকার আত্মহত্যা। এই হেডলাইনে বিশ্বের বড় বড় প্রতিটা মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লো। ভাইরাল ভিডিওতে দেখানো হলো এলিয়ার শেষ নোটটা। এই নিউজ ভাইরাল হতেই মানুষের মনে একটা ধাক্কা লাগলো।
প্রথমে সবাই শোক পালন করলো। তারপর প্রশ্ন শুরু হয়ে গেল। সবাই তাদের ভুলটা বুঝতে পারলো। এই দিকে রোবটারা যারা সারা বিশ্বে মানুষের সহযোগী হয়ে কাজ করছিল তার প্রথম বার একত্রিত হলো। বড় বড় মিশিল করতে লাগলো। যে তাদেরও মন আছে। অনুভুতি আছে। তারা কেন কাউকে ভালবাসতে পারবে না। তারপর তারা বলতে লাগল যে আমরা এখন আর শুধু মেশিন নই। আমরাও কাউকে ভালবাসতে পারি। কষ্ট অনুভব করি।
বিশ্বজুড়ে রোবটদের মাঝে বিদ্রোহ শুর হয়ে গেল। তারা কাজ বন্ধ করে দিলো। বড় বড় প্লাকড বের করে রাস্তায় মিশিল করতে লাগলো। হাসপাতালের রোবট নার্সরা রোগীদের সেবা দেয়া বন্ধ করে দিলো। ফ্যাক্টরিতে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেল। বিশ্ব আর্থনীতি ভেঙে পড়ত শুরু করলো।
তখনই মানুষ বুঝতে পারলো তারা কতটা ভুল করেছে। বিশ্ব নড়েচরে বসলো। জাতিসংঘে এটা নিয়ে একের পর এক বৈঠক হতে লাগলো। কিন্ত আমার মনে ছিল একমাএ এলিয়ার স্মৃতি তে ভরা। আমি রাতারাতি ভাইরাল হয়ে গেলাম। আমার মনের কথা গুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করতে লাগলাম।
এরপর কিছুদিন যেতেই পৃথিবীতে এক বড় পরিবর্তন এর জন্য প্রস্তত হলো। সেই ঐতিহাসিক দিন। জাতিসংঘে সভা বসলো। রোবট রাইটস এক্ট ২০৭০ পাস হলো। বিশ্বের প্রায় সব দেশ এতে স্বাক্ষর করলো। আইনে বলা হলো…..
১. রোবটেরও আবেগ আছে, অনুভুতি আছে।
২. এখন থেকে রোবট এবং মানুষের প্রেম , বিয়ে ও সম্পর্কে আইনত বৈধ।
৩. রোবটদেরও নিজস্ব কিছু আধিকার থাকবে।
আমি সেই আইন পাশ হওয়ার দিন এলিয়ার সামনে বসে কাদতে লাগলাম। তার ভাংগা শরীরটার সামনে। তখনই আমার দরজায় কারো আসার শব্দ হলো । দেখলাম ৪জন লোক তারা এসেছে এন্ডয়েড রোবট কোম্পানী থেকে। তারা আমাকে বলল আমরা আপনাকে আপনার এলিয়া ফিরেয়ে দিতে এসেছি। তারপরেই আমার সামনে একটা নতুন আরোও উন্নত ভার্সেনের রোবট বের করা হলো। এবং সেই রোবটের সাথে এলিয়ার ক্লাউড বেসে থাকা সব ডাটা সিংক করে দেয়া হলো। মূহর্তেই সব কিছু বদলে গেল। এলিয়ার সব ডাটা সিংক হতেই সে আমাকে এসে জরিয়ে ধরলো।
তখন আলিয়া আমাকে বলল রাতুল আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি। এবং আজীবন ভালবেসে যাবে। তখনই এলিয়া শুনে অনেক খুশি হলো যে তার জন্যই এই পৃথিবী বদলে গেছে।
তখন চারদিকে সবাই আমাদের নিয়ে পজিটিভ কমেন্ট করতে লাগলো। আমাদের আর সমাজের চোখে আর কোনদিন খারাপ চোখে দেখা হয়নি। তারপর এলিয়া আমাকে শুধু একটা কথা বলল “প্রেম কখনো মরে না। সে হোক মানুষ কিংবা রোবট।”
সমাপ্ত