Home / উপন্যাস / হুইসেল । Whistle
হুইসেল-whistle-abdul-zabbar-khan-jiboner-golpo

হুইসেল । Whistle

বিকেল পাঁচটার দিকে ঢাকা ইউনিভার্সিটি টিএসসি’র সামনে থেকে একটা রিকশা নিলাম। প্যাসেঞ্জার সুমি এবং আমি।
মাস তিনেকের রিলেশনশিপ। ওর সবগুলো ক্লাস শেষ হতে হতে দুপুর গড়িয়ে যায়। তারপর লাঞ্চ। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে কয়েকটা ক্যাফেটেরিয়া আছে, যেগুলোতে কম খরচে খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল।

প্রায় দুপুরেই ঐগুলোর যেকোনো একটায় আমরা লাঞ্চ সেরে নিতাম।
রিকশা যাবে মহাখালী। সুমিদের বাসা। অনেক দুরের পথ! আমরা প্রায়ই এভাবে যেতাম। একসাথে পাশাপাশি বসে যাবার লোভ। অসাধারণ সব মূহুর্ত!
তরুণী প্রেমিকার পাশে বসে দীর্ঘ রিকশা ভ্রমণ। হাত ধরে বসে থাকা। সুযোগ মতো রিকশার হুডের আড়ালে টুকটাক…..! এগুলো আমাদের সময়ে বিরাট একটা ব্যাপার ছিল! প্রেমিকা থাকলেও কেউ দেখে ফেলার ভয়ে শুধু ঝোপঝাড়ের আড়াল খুঁজতো। রিকশায় চড়লে ধরা খাবার ভয়।

আমার কারনে ওর ভার্সিটি বাসে চড়া রীতিমতো বন্ধই হয়ে গেল। কোন রাস্তায়ই তখন এতো জ্যাম ছিল না। তেজগাঁও শিল্প এলাকা দিয়ে যাচ্ছিলাম।
সুমি হঠাৎ করেই বললো,
: দেখো দেখো! কি সুন্দর ধবধবে সাদা রঙের ছোট্ট একটা গাড়ি! গাড়িটা তখন আমাদের রিকশাকে পাস করে যাচ্ছিলো। আমিও দেখলাম। গাড়িটা সত্যিই খুব সুন্দর! সুমি আবারও একটু আদুরে গলায় বলে উঠলো,
: এই শোন, আমরা কিন্তু এরকম ছোট্ট একটা গাড়ি কিনবো! কোথাও গেলে ওটা নিয়েই যাবো! ওর দিকে তাকিয়ে আমি হাসলাম। মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বললাম,
: অবশ্যই কিনবো! তবে গাড়ি কেনা সম্ভব হবে না। একটা রিকশা কিনে পেছনে প্রাইভেট লিখে দেবো। ব্যস, আরাম করে যেখানে যখন খুশি যাবার ব্যবস্থা পাকা! চলবে তো? সুমির হাসি হাসি মুখটা মুহূর্তেই অন্ধকার হয়ে গেল। বললো,
: তোমার সাথে কেন যে রিলেশনে জড়ালাম, এখনো বুঝতে পারছি না। তুমি মোটেই রোমান্টিক নও! মিথ্যে করেও তো হ্যাঁ বলতে পারতে! আসলে তোমার মধ্যে এই ব্যাপারগুলো নেই।

আমি বললাম,
: পকেটের যে অবস্থা, তাতে করে প্রাইভেট রিকশা কেনার চিন্তা করাটাও চরম বিলাসিতার পর্যায়ে পড়ে। এর মধ্যে আবার গাড়ি! ভাবতেও পারছি না!
সুমি আর কোন জবাব দিলো না। বাকি রাস্তা মুখ অন্ধকার করে বসে রইল।

আজকের দিনটা একটু অন্যরকম ছিল। বেশ কিছু পেমেন্ট পাবার কথা। অবশ‍্য এরকম অনেক পেমেন্টের ডেট শেষ পর্যন্ত ফেইল করেছে। তবুও আশায় বুক বাঁধি।
সকাল সকাল নাস্তা পর্ব শেষ।

সুমি চা নিয়ে ড্রইংরুমে এলো। ওর ঘামে ভেজা মুখটা দেখে মায়ায় মনটা ভরে গেল। এতো দিন কষ্ট করেও বাসায় একটা এসি লাগাতে পারলাম না!
আরামে বড় হওয়া মেয়ে। বিয়ের পর থেকেই আমার সাথে অনেক কষ্ট করছে! বেচারী!
দেড় বছর হলো আমরা বিয়ে করেছি। বড় মেয়েটার বয়স এখন প্রায় সাত আট মাস হবে।
সংসারের সব ঝামেলা সুমি একাই সামলায়।

বাজার করা থেকে শুরু করে বাচ্চার দেখাশোনা, সব কাজ একাই করে। ও খুব রুটিন মেনে চলে।
নাস্তা, লাঞ্চ, ডিনার সব ঠিক টাইমে টেবিলে হাজির করবে। আমি অবশ্য লাঞ্চটা অফিসেই সারি।
দরোজায় দাঁড়িয়ে বিদায় দিয়ে বললো,
: ঠিক টাইমে লাঞ্চ করে নিও! তোমার তো আবার হুঁশ থাকে না! আমি মাথা ঝাঁকিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলাম।

পুরনো ঢাকার একটা শো রুমে বসে আছি।
বুকের ভেতরে একশোটা হুইসেল বাজছে। সারা পৃথিবীটা আনন্দময় হয়ে গেছে! আমার ব্যবসায়ী জীবনের সবচাইতে বড় পেমেন্টটা একটু আগেই রিসিভ করেছি। খাকি রংয়ের একটা বিশাল সাইজের খামে ভরা টাকাগুলো নিতান্তই অবহেলায় আমার সামনে টি টেবিলে পড়ে আছে। ওটার দিকে তাকাচ্ছিও না। যেন এসব কোন ব্যাপার না। আমি কথা বলছি ক্লায়েন্টের সাথে। ক্লায়েন্ট অফার দিলেন,
: এতগুলো টাকা নিয়ে একা একা যাবেন! আমার গাড়িটা নিয়ে যান! পৌঁছে দিয়ে আসুক!
আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম,
: এটা কোন ব্যাপার না! যেন এরকম লেনদেনে আমি বরাবরই অভ্যস্ত, এমন একটা ভাব দেখিয়ে একটা স্কুটারে উঠে বসলাম। স্কুটার ড্রাইভারকে সোজা ধানমন্ডি যেতে বললাম।

তারপর থেকে ওই বিশাল খামটা হাতে নিয়েই
ধানমন্ডির একটা কার শো রুমে বেশ অনেক্ষণ ধরে গাড়ি দেখছি। সেলস ম্যানেজার নানা কায়দায় আমাকে বিভিন্ন মডেলের গাড়ির বর্ণনা দিচ্ছেন। একটার পর একটা গাড়ি দেখাচ্ছেন। কিন্তু খুব একটা সুবিধা করতে পারছিলেন না। কারন, গাড়ি সম্পর্কে আমার আগ্রহ বরাবরই কম। তাই বুঝিও কম। বাবা সরকারি বড়কর্তা হবার কারনে ছোট বেলা থেকেই গাড়িতে চড়ে বড় হয়েছি। ব্যস! এইটুকুই আমার অভিজ্ঞতা!
বড় ভাইয়া আবার আমার মতো না। বাবার ড্রাইভারদেরকে পটিয়ে পটিয়ে ক্লাস সেভেনে থাকতেই ড্রাইভিং শিখে ফেলেছেন। পনেরো ষোলো বছর বয়সে রীতিমতো ওস্তাদ!

দুর্ধর্ষ ম্যানেজার! আমার মতো বেকুব ক্লায়েন্টকে শেষ পর্যন্ত একটা পনেরোশো সিসি’র ধবধবে সাদা রঙের টয়োটা ক্যারিনা পছন্দ করিয়েই ছাড়লেন!
দামাদামি, পেমেন্ট পর্ব শেষ। চেয়ারে বসে আছি। ভদ্রলোক বললেন,
: স্যার, আপাতত একটা গ্যারেজ নাম্বার প্লেট লাগিয়ে দিচ্ছি। তিন চারদিন পর একবার একটু কষ্ট করে আসবেন! নতুন নাম্বার প্লেট লাগিয়ে দেবো! ওইদিনই কাগজপত্র সব পেয়ে যাবেন!
গাড়িটা কি আপনিই চালিয়ে নিয়ে যাবেন?
প্রশ্নটা বেশ সন্দেহ নিয়েই করলেন। আসলে উনি বুঝে গেছেন, গাড়ি সম্পর্কে আমার নলেজ জিরো।
তার প্রশ্ন শুনে আমি চমকে গেলাম!
তাইতো! আমিতো কোন ড্রাইভার সঙ্গে আনিনি।

এখন গাড়িটা কে চালিয়ে নিয়ে যাবে!
বেশ খানিকটা ঘাবড়ে গেলাম। বললাম,
: একটা ফোন করতে পারি?
সেলস ম্যানেজার ত্বরিত জবাব দিলেন,
: অবশ্যই স্যার! আপনি আমাদের সম্মানিত ক্লায়েন্ট। একটা কেন! একশোটা কল করতে পারেন! বলেই ফোনটা টেবিলের উপর দিয়ে আমার দিকে এগিয়ে দিলেন।
পকেটে রাখা ছোট ফোনবুকটা দেখে ভাইয়ার কর্মস্থলে ফোন দিলাম। আল্লাহর অশেষ রহমতে ওনাকে পেয়েও গেলাম। কোনরকমে একটু ঘটনাটা বললাম। ভাইয়া কথা না বাড়িয়ে শুধু লোকেশন জানতে চাইলেন। বিশ পঁচিশ মিনিটের মধ্যে হাজির। গাড়ি দেখে খুব খুশি!
কিন্তু বকাঝকা করেই চলেছেন।

: তোমার হুঁশজ্ঞান কবে হবে? আমাকে আগেই বলা উচিত ছিলো! এখন ফোন দিয়ে যদি আমাকে না পেতে!
ভাইয়া এক্সপার্ট। ম্যানেজারকে নিয়ে পুরো গাড়িটা ভালো করে চালিয়ে চেক করে নিলেন। স্পেয়ার পার্টস, এক্সট্রা চাকা, টুলবক্স, এসির কন্ডিশন সব কিছুই দেখে নিলেন। আমি শুধু অবাক হয়ে ভাইয়ার কাজকারবার দেখলাম। অবশ‍্য এরিমধ্যে আমি আমার বন্ধু মতিকে ফোন করে ড্রাইভার নিয়োগের ব্যাপারে সাহায্য চাইলাম। ও সাথে সাথেই কনফার্ম করে দিলো যে সন্ধ্যার মধ্যেই ড্রাইভার আমার বাসায় পৌঁছে যাবে। বড় ভাইয়া ইন্টারভিউ করে নিলেই হবে।

বিকেল চারটার দিকে আমরা গাড়ি নিয়ে আমার মগবাজারের বাসায় পৌঁছলাম। ভাইয়া গাড়িতেই বসে রইল।
আমি দোতলায় আমার ফ্ল্যাটে উঠে সুমি আর মেয়েকে নিয়ে নেমে আসলাম। মেয়ে আমার কোলে। পেছনের দরোজা খুলে দিয়ে বললাম,
: গাড়িতে ওঠো! বলে মেয়েকে পেছনের সিটে বসিয়ে দিলাম। সুমি একটু হতভম্ব হয়ে বললো,
: কোথায় যাচ্ছি আমরা? ভাইয়া চালাবে? গাড়িটা কার? তাছাড়া, আমি এই ঘরের ড্রেসে কোথাও যাবো না! আমি বললাম,
: ওঠোই না! পরে বলছি!
আমি ভাইয়ার পাশে বসলাম। মিনিট দশেক এদিক সেদিক ঘুরে বাসায় ফেরত আসলাম। এরইমধ্যে সুমির নানারকম প্রশ্ন। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জবাব দিলাম। ভাইয়া মিটিমিটি হাসছিলেন।

গাড়ি থেকে নেমে সুমিকে বললাম,
: পছন্দ হয়েছে? তোমার জন্যেই কিনলাম।
ধবধবে সাদা রং। কালার ঠিক আছে না! এখনতো আর আমরা শুধু দুজন না। তাই একটু বড় গাড়িই কিনতে হলো।
সুমি আনন্দে হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো।

পিচ্চিটা তার বড় চাচ্চুর কোলে চড়ে অস্পষ্ট স্বরে গাড়ি গাড়ি বলে চেঁচিয়ে যাচ্ছিলো। আমার বুকের ভেতরে আবার একটানা হুইসেল বাজতে শুরু করেছে। চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছে। ধরা গলায় বললাম,
: চলো, সবাই উপরে চলো!

লেখাঃ আবদুল জাববার খান

Facebook Comments

About Priyo Golpo

Check Also

গল্প বিচিত্রা – আপনার পড়া উচিত

(১) আজকে বিচিত্রা খুলে অদ্ভুত একটি বিজ্ঞাপন দেখলো সুমি। একজন প্রবাসী লিখেছেন,” আইডিয়াল স্কুল এবং …

error: Content is protected !!