Home / গল্প / যন্ত্রণার দ্বিতীয় প্রহর – সত্য প্রেমের গল্প
love, romantic, heart touching

যন্ত্রণার দ্বিতীয় প্রহর – সত্য প্রেমের গল্প

প্রথম পিরিয়ড হলো যেদিন আম্মা বাড়িতে ছিলেন না।বড় দুই ভাইয়ের পরে  আমি আর ছোট বোন। আমি  হুটহাট কথা বলি, চঞ্চল স্বভাবের। যখন যা মনে আসে তাই বলি।সেদিন আমি কেমন যেনো ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম কথা বলা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছি।

আব্বা পাশের বাড়ির খালাম্মা কে ডেকে বললেন-

-মেয়ে টা কে একটু দেখে যান।

তখন এমন একটা সময় মেয়ের সাথে মা ও এসব বিষয়ে কথা বলতে ইতস্ততা বোধ করতো।

বিকেলে দিকে আব্বা আমার মাথায় হাত রেখে বললেন কিছু হয়নি,চলো বেরিয়ে অাসি।

আব্বা আমার পছন্দে পুতুল কিনে দিলেন। আব্বা গাড়ি,ফুটবল কিনলেন।
হাই স্কুলে পড়লেও খেলা-ধুলা থেকে তখন ইস্তফা দেবার বয়স ছিলো না।
আব্বা গাড়ি ফুটবল কেনো কিনলেন বুঝতে পারছি না।

বাড়ি ফেরার পরে আব্বা বল আর খেলনা গাড়ি আমাকে দিয়ে বললেন-

যে যতো সাহসি তার কাছে ততো বড় দায়িত্ব দেয়া হয়। আল্লাহ তায়ালা মেয়েদের এমন এক শক্তি দান করেছেন যা ছেলেদের দেননি। তুমি সম্মানিত তোমার পদতলে জান্নাত দান করা হয়েছে,তোমার মাঝেই দান করা হয়েছে নতুন আরেক সৃষ্টির কারখানা।ছাড় সবাই দিতে পারে না,যে ছাড় পায় সে ভাবে সে জিতে যায়।ব্যাপার টা  আসলে সেরকম নয়।
সাহস লাগে ছাড় দিতে,হৃদয়ের প্রসস্থতালাগে।
ভয়ের কিছু নেই মা,এখন হয়তো আমার কথা গুলো বুঝতে কষ্ট হচ্ছে, কথা গুলো মনেরেখে সাহস নিয়ে চলবা।

ভাত খেতে বসে, আমার প্লেট আসা চিংড়ি মাছ গুলো তুলে রেখে দিলাম তরকারির বাটিতে।

আম্মা চিংড়ি মাছ পছন্দ করেন, কিন্তু কখনোই তৃপ্তি নিয়ে খেতে দেখি না।

আম্মা খেতে বসে সেই মাছ গুলো সব ভাইয়ের পাতে তুলেদেন। দেখে আমার গলাব্যাথা করে, চোখে জল আসতে দেই না। চোখে জল দেখে যদি ভাবেন আমি হিংসুটে।

আম্মা আমাকে অবহেলা করেন সেটা বলবো না।

আম্মা আমাকে ভালোবাসেন।  আমার জ্বর হলে সারারাত বসে মাথায় পানি দেন, লেখাপড়া করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা দেন।

ঐসব ভালোবাসা আমার চোখে খুব একটা পরে না,ছোট্ট ছোট্ট ভালোবাসা গুলো বেশ আয়োজন করে চোখে ধরা পরে।

বিলেবু নামটা আমার মনে থাকে না।বাড়িতে মেহমান এলে বাড়ির এক কোনে বাতাবি লেবু গাছ টা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেন-

এটা কি গাছ?

আমি বিজ্ঞের মতো বলে দেই আপেল গাছ। ছোট ছোট  আঙ্গুলের মতো টক সবুজ সবুজ আপেল হয়। আম্মা মাছ দিয়ে সেই আপেল রান্না করেন।অনেক মজা হয় সেই তরকারি টা।
মেহমান আমার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে।
মনেনেই কথা টা বলা আমার পছন্দ না। আবার কথা সংক্ষিপ্ত করাও আমার পছন্দ না।

দাদী খুবই বিরক্তি নিয়ে বলেন-

তুই কার মতো হইছত এতো বাচাল।এতো তেড়েং তেড়ং করছ, বেটি  আর বান্দী এক, বেটা আর বাদশা এক।
মাটির মতো চুপ থাকবি,কাইট্টা ফালাইলেও নড়াচড়া নাই এমন।

আমি বলি-

কবরে গেলে তো মাটি এমন চাপ দিবো দুই পাঁজর এক করে ফেলবো।সুযোগ পাইলে মাটি কি চুপ থাকবে।

দাদী কিছু বলে না, সুপারি কাঁটে  আর বিড়বিড় করে।

দিন এমন করেই যাচ্ছে  আমার আর একটু একটু করে অনেক টা বড় হয়ে গেছি।

আমি প্রাইভেট স্যারের প্রেমে পরেছি। স্যার কে দাদী আধবুড়া ডাকেন। মাস্টার্স কমপ্লিট করেছেন পাঁচ বছর আগে।
দাদীর মতে স্যারের বিয়ের বয়স পার হয়ে গেছে। তাকে বিয়ে করার মতো কোন পাত্রী দেশে নাই।

স্যারের হাত টা ছুঁয়ে দেখতে আমার ইচ্ছে হয়। স্যার কে চায়ের কাপ হাতে দেয়া যায় না। টেবিলে রাখতে হয়। তবে টাকার খাম টা তিনি হাতেহাতে নেন।সেই ফাঁকে হাত টা একটু ছুঁতে পারি।

আমি স্যার কে দুই বার বেতন দেই। একবার আব্বার টাকা আরেক বার আমার জমানো টাকা।

আর সে জন্য আমাকে কলেজে হেঁটে যেতে হয়,পছন্দের কানের দুলটা আমার ক্লাসম্যাটট তিথীর কানে শোভা পাচ্ছে, প্রাইভেট পড়াতে হয়।

স্যার কে সময় অসময়ে বেতন দিলে কিছু জিজ্ঞেস করে না, চুপচাপ বেতন টা হাতে নেন।

হয়তো তিনি ভাবেন এই বাড়িতে প্রাইভেট টিচারের মাস হয় পনেরো দিনে।তাই তিনি খুব বিনয়ী ভাবে দরজায় কিলংবেল থাকাসত্বেও দুইবার টুকা দেন।

প্রথম বার টুকা দিয়ে দ্বিতীয় টুকা দেন গুনে গুনে ত্রিশ সেকেন্ড পরে।অামি কান পেতে থাকি অাঙ্গুলের কড়ে গুনি, হয়তো তিনি ও তার হাত ঘড়িটায় সময় দেখে টুকা দেন।হয়তো, তিনি চিন্তা করেন এই পরিবার কে বিরক্ত করলে চাকরি থাকবে না।

তাকে নিয়ে আমার অনেক ‘হয়তো’ ধরনের চিন্তা মাথায় অাসে।

একবার খামে করে চিঠি দিলাম স্যার কে।
পরেরদিন স্যারের অগ্নি মূর্তি। ইন্টারমিডিয়েট পড়া ছাত্রী স্যার, কে তার ভালোবাসার কথা জানিয়ে পত্র দেয়া বিশাল অন্যায় বুঝিয়ে দিলেন। আর আমাকে পড়াবেন না বলে চলে গেলেন।

আমি তার চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখছি  আর ভাবছি ভালোবাসা ও একধরনের অপরাধ।

সাতদিন হলো স্যার আসে না। আমার বিয়ের কথা অনেক আগে থেকেই চলছে।ইচ্ছে ছিলো স্যার যদি আমাকে ভালোবাসে তবে বাসায়, তার কথা বলবো।
না মানলে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দরজা বন্ধ করে ম্যারাথন ঘুম দেবো। ফাঁক ফোঁকরে লুকিয়ে লুকিয়ে খাবো,  আমার আবার ক্ষুদা সহ্য হয় না।

বিয়ে ঠিকঠাক হয়ে গেলো,বিয়ের বাজারের ধুম চলছে। আঠারো দিন হয়েগেলো স্যারের কোন খোঁজ নেই।
আমি ছাদে বসে তাকে মনেকরে কাঁদলাম, চোখ-মুখ ফুলিয়ে ঘরে আসলাম আমার ছোট বোন চন্দ্রা কদম ফুল একটা কাঁচের গ্লাসে পানি নিয়ে সাজিয়ে রাখতে রাখতে বললো-

-তন্দ্রা’পা কাঁদছিস কেনো?

কোন উত্তর দিলাম না। আমার রুমে গিয়ে গায়ে হলুদের শাড়ি টা পরলাম।
বর্ষার সিজনে সিনেমার নায়িকার নীল শাড়ি পরে। আমার নিজের কোন শাড়ি নেই,নীল শাড়ি পরার খুব ইচ্ছে ছিলো।

চোখে কাজল দিলাম,কাজল দিলে আমাকে দেখতে অনেক মিষ্টিলাগে।ঠোঁটে লিপবাম দিলাম।

চন্দ্রার কাছে কিছু টাকা হবে কি না জিজ্ঞেস করলাম।মেয়েদের হাতে লুকানো ভাবে জমানো টাকা থাকে আমার জমানো কোন টা নেই।

কদম ফুল পাতাসহ কানে গুজে কালোক্লিপ দিয়ে আটকে নিলাম।হাতে চুড়িপরার কথা মনেছিলো না, দৌড়ে গিয়ে চুড়ি পরলাম। আমার হলুদ রেশমি চুড়ি নেই।
গায়ে হলুদের জন্য ফুলের চুড়ি,গয়না কেনা হয়েছে।
তাই বাধ্য হয়ে সাদা রেশমি চুড়ি দুইহাত ভরে পড়লাম।
হলুদ শাড়ির সাথে সাদা,রেশমী চুড়িতে নাকি আমাকে কদম ফুলের মতোই অপূর্ব লাগছে।ছোট বোন চন্দ্রা  আরো বলেছে তাদের হবু দুলাভাই আমাকে দেখলে নির্ঘাত জ্ঞান হারাবে।

গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পরছে। আব্বার বড় ডাটের ছাতা টা নিয়ে বিকেলে বেড়িয়ে পরলাম। মেয়েরা এমন ছাতা নিয়ে বাহিরে যায় না,মেয়েদের ছাতা হয় সুন্দর ছিমছাম।
আমার ছাতা টা ও ছিমছাম,খয়েরী রংয়ের।

এখনো মনের কোনে ক্ষীণ আশা জ্বলে আছে ।
ছেলেদের হাতে ছিমছাম ছাতা মানায় না এমন অগোছালো, বেখাপ্পা জিনিস গুলাই মানায়।

আম্মা চোখ বড় বড় করে বাঁধা দিচ্ছেন। কোথায় যাচ্ছি?কেন যাচ্ছি?গায়ে হলুদের শাড়ি টা কেন পরেছিস? আম্মা আমাকে হাজার টা কেনো তে বন্দী করতে চাচ্ছেন।

আব্বা, ছোট্ট করে বললেন –

-একটু নিজের মতো ছেড়ে দাও।ক’দিন পরেই তো বিয়ে মেয়েটার।

টাকা আছে কিনা আব্বা জানতে চাইলো। আব্বার কাছে আমার প্রয়োজনের টাকা নিতাম। যদিও কখনো নিজের জন্য খরচ করতাম না। আজ আর আব্বার কাছ থেকে টাকাট নিতে ভালোলাগছে না।

বেশ জোরে বৃষ্টি নেমেছে। স্যারের মেসে গেলাম, স্যার নেই মন খারাপ করে বেরিয়ে পরলাম।

দূর থেকে স্যার কে দেখা যাচ্ছে বৃষ্টি ভিজে আসছে। অসম্ভব সুন্দর লাগছে তাকে
একটা ছেলে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে তার ঘরে ফিরার দৃশ্য এতো সুন্দর হতেপারে, কখনো চোখে ধরা পরেনি।
হয়তো ধরা পরতো। গল্প-উপন্যাস গুলোতে বৃষ্টি ভেজা মেয়েদের সৌন্দর্যের কথাই বলা হয় তাই হয়তো।হয়তো বা তাকে ভালোবাসি এর জন্য।

স্যারের হাতে চিঠি দিয়ে বললাম,দ্বিতীয় বারের মতো অন্যায় করে ফেললাম।
মাথা টা ভালো পানি দিয়ে ধুয়ে নিবেন,জ্বর আসতে পারে।

সে আমার  চলে আসার পথে একবার ও ডাকে নি,একবারও বলেনি এই বৃষ্টিতে কি ভাবে যাবে।
আমি ও তাকে বলতে পারিনি ছাতা টা আমাদের জন্য এনেছিলাম।

চিঠিতে লিখেছিলাম-

স্যার,
ভালোবাসেননি বলে এক ঝটকায় সরে গেলেন।ভালোবেসে সেই ঝটকা টা সামলানো খুব কষ্ট হয়ে গেল।ধীরে ধীরে চলে যেতে হয় স্যার।

যেখান থেকে ভালোবাসা  আসেনি সেখানে অভিমান পোষে রাখার কোন মানে থাকে না।

স্যার কে ভুলতে না পারলেও,তার জন্য মনপুরে না আর আগের মতন।

আমার জন্য গায়ে হলুদের কাপড় আবার কিনা হলো।

বিয়ের পরে বর কে নিয়ে বাবার বাড়ি আসলাম। ঘরে ঈদ ঈদ আনন্দ, আমার ভাই-বোনেরা আড্ডায় মেতে উঠেছি দুপুরের খাবার শেষে।

দরজায় খুব পরিচিত একটা টুকার শব্দ শুনে নিজের মতিভ্রমের লক্ষণ ভাবলাম। তারপর ও অভ্যাসগত কারনে গুনতে লাগলাম।

আমি পাথর হয়ে যচ্ছি ,পা ঠান্ডা হয়ে আসছে।

দরজার ও পাশে স্যার হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। এমনিতেই এই হাসি আমাকে লুটপাট করে দেয়।

-এই অবেলায় শাড়ি পরে আছো যে, তন্দ্রা।

স্যার হয়তো আমার বিয়ের খবর টা জানেন না। বললাম-

-আপনি আসতে বড্ড বেলা করে ফেলেছেন স্যার।

সে কিছু বুঝেছে বলে মনে হচ্ছে না, তার ব্যাগ থেকে একটা ডায়রি, অনেক গুলো গোলাপ বের করতে করতে বললো-

-খাইতে পারিনা, যে দিকে তাকাই তোমার মুখ টা ভাসে। ভাবলাম বাড়ি যাই সব ঠিক হয়ে যাবে। সেখানে গিয়ে আরেক যন্ত্রণা দেখা দিলো রাতে ঘুমাতে পারি না। মনে হয়ে তোমার কাছ থেকে অনেক দূরে চলে এসেছি। কখন যে তোমাকে ভালোবাসে ফেলেছি টের পাইনি।

তার হাত ধরার হাজার বাহানা খুঁজতাম ক’দিন  আগেও। আজ সে নিজে থেকে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। বরং আমার ভীষণ অসহ্য না কি অসহায় লাগছে বুঝতে পারছিনা।

ভালোবাস না পেয়ে যন্ত্রণায় ছিলাম । এখন তো দেখছি ভালোবাসা পেয়ে মহা যন্ত্রণায় পরে গেছি।

নতুন করে আরেক সমস্যায় স্যার আমাকে ফেলে গেলেন।
এর প্রভাব পরলো আমার নতুন সংসারে।

আম্মা ব্যাপার টা কি ভাবে বুঝতে পারলেন জানি না।হয়তো মা’দের ধর্মই এমন, সন্তানের মুখ দেখে মন পড়ে ফেলা।

আম্মা আমার মাথায় হাত দিয়ে বললেন-

“বৈশাখে যে ঝড় আসে তার প্রস্তুতি নেয়া যায়, তার নাম বৈশাখী ঝড়। বৈশাখের পরে যে ঝড় আসে তা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, তা মোকাবেলা করে চলতে হয়।”

আম্মার এই দুই লাইনের কথা সেদিন আমাকে অনেক কিছু বুঝিয়ে দিলো। আমি আমার সংসারের দিকে মনোযোগ দেবার চেষ্টা করতে লাগলাম।

 

লেখাঃ তানজীনা  আফরিন মেরিন

Facebook Comments

About Priyo Golpo

Check Also

গল্প বিচিত্রা – আপনার পড়া উচিত

(১) আজকে বিচিত্রা খুলে অদ্ভুত একটি বিজ্ঞাপন দেখলো সুমি। একজন প্রবাসী লিখেছেন,” আইডিয়াল স্কুল এবং …

error: Content is protected !!