Home / উপন্যাস / যত্নহীন ভালোবাসা
যত্নহীন ভালবাসা careless Love - sad girl in love, Indian rapped Sexy girl, hot pussy indian sweet women
images of sad girl sitting alone sad girl dp images of sad girl sitting alone with quotes very sad images of love alone girl images for whatsapp sad girl picture sad girl wallpaper download sad images download

যত্নহীন ভালোবাসা

জিনিয়া রাসেল।
নয় বছর বয়েসী এক পুত্রের জননী।
বয়স পঁয়ত্রিশ পার হয়েছে।
কিন্তু দেখলে মনে হয় তেইশ চব্বিশ হবে।
চেহারা এবং ফিগার থেকে বারো বছর গায়েব হয়ে গেছে। অসম্ভব রূপবতী এই বয়সেও!
বেশি রূপবতী হবার ধকল গুলো খুব সহজেই সামলে নিয়েছেন তিনি।
ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় থেকেই এই ধকলের শুরু। ছেলেপেলেরা ছোট ছোট কাগজে চিঠি লিখে হাতে ধরিয়ে দিতো। আই লাভ ইউ টাইপ চিঠি। ওই ভালোবাসা গুলোর সবটুকু মায়ের কাছেই গেছে। তিনি কোন চিঠি পেলেই সোজা এসে মায়ের হাতে ধরিয়ে দিতেন।
সেভেনে ওঠার পর নতুন একটা সমস্যা
দেখা দিলো। কোন কোন পুরুষ টিচার খাতায় লেখা দেখে প্রশংসা করার ছলে পিঠ চাপড়ে দিতেন।
কখনো কখনো ওই হাত আর সরতে চাইতো না।
প্রশংসা চলছে। আর ওই হাত পিঠের ওপর কি যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে। নোংরা ঘিনঘিনে একটা অনুভুতি নিয়ে জিনিয়া দাঁড়িয়ে পড়তো। ব্যস, হাত সরে যেতো। তার খুবই ইচ্ছে করতো, ওই টিচারের গালে কষে একটা চড় লাগাতে। যদিও ওই ইচ্ছেটা কখনোই পূরণ করা হয়নি।
কেন যেন এসব তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা মাকেও কখনো খুলে বলতে পারেননি। ভয় হতো, মা হয়তো স্কুলে যাওয়াই বন্ধ করে দিতে পারে!
একটা লাভ অবশ্য হয়েছে। প্রচন্ড বিরক্তিকর এসব তিক্ততার কারনে খুচরা কোন প্রেমে কখনোই জড়িয়ে পড়েননি।
:
প্রেম একবারই এসেছে তার জীবনে।
ভার্সিটিতে পড়ার শেষ সময়টায়। শর্টকাট প্রেম। ভদ্রলোকের নাম ইয়ামিন রাসেল। এক্সপোর্ট ইম্পোর্টের ব্যবসা করেন। মাস ছয়েক পরেই বিয়ে হয়ে গেল।
মামাতো বোনের গায়ে হলুদে দেখা। ধানমন্ডির একটা অডিটোরিয়ামে প্রোগ্রাম।
উনি ছেলে পক্ষের আত্মীয়। ছাই রঙের একটা পাঞ্জাবি ও সাদা সালোয়ার পরে দাঁড়িয়েছিলেন একটা কর্নারে। বয়স বড়জোর সাতাশ আটাশ হবে।
ভালো লাগছিলো দেখতে। কোন ছ্যাবলামি নেই।
হাসিমুখে সবার সঙ্গেই স্বাভাবিক ভাবে কথা বলছিলেন। কয়েকবার চোখাচোখি হবার পর
হাত ইশারায় কাছে ডাকলেন। হাসিমুখের সহজ সেই ডাক অগ্রাহ্য করা কঠিন।
জিনিয়া এগিয়ে গেল।
:
ভদ্রলোক সহাস্যে বললেন,
: আপনার আর আমার ড্রেস কম্বিনেশন একদম মিলে গেছে! অবশ্য আপনাকেই বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে!
ভদ্রলোকের প্রশংসা করবার ভাষা শুনে জিনিয়া মুগ্ধ! একই সাথে খানিকটা চমকে গেল!
তাইতো! ছাই রঙের টপস্ এর সঙ্গে সাদা একটা টাইটস পড়ে ছিল সে। হাসিমুখে জবাব দিলো,
: থ্যাংকস! আপনাকেও ভালো লাগছে! বলতে গিয়ে জিনিয়ার ফর্সা মুখ আরক্ত হয়ে উঠলো।
আজ পর্যন্ত কখনোই কোন পুরুষের প্রশংসা করা হয়ে ওঠেনি।
ভদ্রলোক আবারো খুব সপ্রতিভ চাহনি দিয়েই বলে উঠলেন,
: আমি একটা ব্যাপারে কনফার্ম যে এই আসরে আপনার মতো সুন্দরী আর কেউ নেই।
আমার হোল লাইফে আপনার মতো সুন্দর কাউকে চোখে পড়েনি। এরকম সুন্দরী একজন মেয়ে ছেলেদের নানারকম ন্যাগিংয়ে এমনিতেই খুব চটে থাকে। কিছু কথা বলার ছিল। এখন বলতে চাচ্ছি না। যদি কাইন্ডলি সময় করে একটা ফোন করেন, হয়তো তখন বলবো! বলে একটা ভিজিটিং কার্ড এগিয়ে দিলো।
জিনিয়া হাত বাড়িয়ে কার্ডটা নিলো।
নিচু গলায় শুধু বললো,
: ওরা ডাকছে। আমি যাই। বলেই গায়ে হলুদের স্টেজের দিকে এগিয়ে গেল।
সাউন্ড সিস্টেমে মৃদু শব্দে বেজে চলেছে বিসমিল্লা খাঁ’র সানাই।
:
ক’দিন ধরেই তিনি লক্ষ্য করছিলেন, ইয়ামিন বেশ রাত করে বাসায় ফিরছে। সবসময় অন্যমনস্ক হয়ে থাকে। জিজ্ঞেস করলে পরিষ্কার করে কিছু বলে না।
বিয়ের পর প্রায় বারো বছর হয়ে গেল। ইয়ামিন আগে কখনোই এমনটা করেনি। ও খুবই গোছানো মানুষ! যতো কাজই থাকুক, রাত আটটার মধ্যে বাসায়। এসেই কিছুক্ষণ ছেলে রাহুলকে নিয়ে লাফালাফি দাপাদাপি করে। হঠাৎ করে কি এমন হলো!
জিনিয়া নিজেও একটা বুটিক চালান। শো রুমটা এই ধানমন্ডিতেই। রাত নয়টার মধ্যেই তিনি বাসায় ফেরেন। এর মাঝে অবশ্য একবার তাকে আসতে হয়। রাহুলকে স্কুল থেকে নিয়ে বাসায় পৌঁছে দেন।
ছেলের সাথে লাঞ্চ করে আবার শো রুমে চলে যান।
বাকিটা খুবই বিশ্বস্ত একজন বুয়া দেখাশোনা করে।
ইয়ামিন প্রতিদিনই দেরিতে ফিরছে দেখে বুয়াটাও ইদানিং প্রায়ই গজগজ করে। দুদিন আগে তো বলেই ফেললো,
: আফা, কিছু মনে কইরেন না! বেডা মানুষ এতো রাইতে ঘরে ফিরনডা ঠিক ঠেকতাছে না। কুনো বেডির ফাল্লায় ফরছে কিনা, খুজ খবর লইন!
জিনিয়া অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে হয়ে বললেন,
: বুয়া, ফালতু বকবক করোনা! তুমি থালাবাটি মেজে ঘুমাতে যাও!
ইয়ামিন ফিরলো রাত সাড়ে বারোটায়।
জিনিয়া খুব কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলো,
: প্রায়ই রাত করে বাসায় ফিরছো!
ঘটনা কি? নতুন কিছু শুরু করলে নাকি!
এভাবে কি সংসার চলে!
ইয়ামিন কোন জবাব না দিয়ে ফ্রেশ হয়ে ঘুমাতে চলে গেল। না খাওয়া, না কোন কথাবার্তা!
:
আজকেও ফিরতে ফিরতে রাত বারোটা।
জিনিয়া তৈরি হয়েই ছিলেন।
একটা হ্যাস্তন্যাস্ত করেই ছাড়বেন! ড্রইং রুমে বসেই তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন,
: ছেলে ঘুমাচ্ছে। এখানে বসো! তোমার সাথে আমার জরুরি কিছু কথা আছে।
ইয়ামিন ক্লান্ত কন্ঠে বললেন,
: কাল বলা যায় না? আমার খুব ঘুম পেয়েছে।
জিনিয়া চিৎকার করে উঠলেন,
: প্রতিদিনই তো তাই বলছো! আজকেই কথা বলতে হবে! এখনই! আমি ফয়সালা করতে চাই!
যদি না হয়, আমি ছেলেকে নিয়ে কালই বাবার বাড়ি চলে যাবো! এভাবে আমি সংসারে থাকবো না!
ইয়ামিন বললেন,
: বাবার বাড়ি যাবে। যাও! আমিতো তোমার কোন কাজে কখনোই বাধা দেইনি।
জিনিয়া চড়া গলায় বললেন,
: আমি এবার গেলে, বেড়াতে যাবো না।
একেবারেই যাবো! রাহুলকেও নিয়ে যাবো!
সংসার করার সাধ আমার মিটে গেছে! কথা বলতে বলতে জিনিয়া ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন।
ইয়ামিন সাহেব ক্লান্ত দৃষ্টিতে খানিক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন,
: তোমার যা যা করতে ভালো লাগে, করো! আমি ঘুমাতে গেলাম।
দৃষ্টিতে গভীর বেদনা নিয়ে জিনিয়া তার চলে যাওয়াটা দেখছিলেন।
:
জিনিয়া প্রায় একমাস ধরে বাবার বাড়িতেই থাকছেন। সংসদ ভবনের পাশেই মনিপুরী পাড়ায় বাবার বাড়ি। ছয়তলা বাড়ির তিন তলায় তারা থাকেন। বাকি পুরোটাই ভাড়া দেয়া।
ধানমন্ডিতে স্বামীর ফ্ল্যাট ছেড়ে আসার সময় ছেলে রাহুলকেও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন।
নিছক বেড়াতে আসেননি।
প্রচন্ড ঝগড়া করে চলে আসা।
:
প্রায় একমাস হয়ে গেছে। রাহুলের বাবা অবশ্য দুদিন পর একবার এসেছিল।
বাসায় ফেরার জন্য অনুরোধ করছিলো। জিনিয়ার বাবা মাও কম্প্রোমাইজ করার অনেক চেষ্টা করলেন। লাভ হয়নি। কোন রকম ফয়সালা ছাড়া জিনিয়া ফিরবে না। এরপর আর কোন খোঁজ খবর নেই।
:
শো রুমটা ম্যানেজার মেয়েটাই চালাচ্ছে। মাঝে মাঝে অবশ্য জিনিয়া নিজেও সময় দেন। রাহুল তার নানার গাড়িতেই প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া আসা করছে। স্কুল থেকে ফিরেই জিজ্ঞেস করে,
: মা, বাবা কি এসেছিলো? ফোন করেছিলো?
আমরা কবে বাসায় যাবো? কতোদিন বাবার সাথে খেলি না! বাবা নিশ্চয়ই আমার জন্য অনেক মন খারাপ করে আছে!
জিনিয়া তীব্র স্বরে বলে ওঠেন,
: তোমার জন্য মন খারাপ করার সময় তার আছে?
তাছাড়া, বাসায় যাবে, বাসায় যাবে করছো কেন?
আমরা কি ফুটপাতে পড়ে আছি!
ছোট্ট রাহুল গভীর বিষাদ নিয়ে তাকিয়ে থাকে মায়ের দিকে।
:
মোবাইল ফোনের রিংটোন বেজেই চলেছে।
ফোন কোম্পানি গুলো অনেক গবেষণা করে কতো সুন্দর সুন্দর রিংটোন তৈরি করে। শুনতে ভালোই লাগে।
কিন্তু শীতের এই ভোরে টানা রিংটোনের শব্দ জিনিয়ার মাথা ধরিয়ে দিলো। রাহুল ঘুমিয়ে আছে পাশেই। ওর ঘুমটাও না ভেঙ্গে যায়! ফোনটা মাথার পাশেই একটা টি টেবিলে রাখা। লেপের তলা থেকে হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিয়ে রিসিভ করলেন।
ধানমন্ডি বাসার কেয়ারটেকার টুটুলের কল।
ওপাশ থেকে একটা নার্ভাস কন্ঠ ভেসে এলো।
: হ্যালো! জিনিয়া ম্যাডাম বলছেন?
এতো সকালে টুটুলের কল দেখে ভীষণ অবাক হলেন জিনিয়া! বললেন,
: হ্যাঁ! কি খবর টুটুল! হঠাৎ এই সময়ে…!
: স্যরি ম্যাডাম! আপনি প্রায় মাসখানেক ধরে এখানে থাকেন না। কিন্তু স্যার তো থাকেন।
মাঝে মাঝে বের হন। আবার চলে আসেন।
গত চার পাঁচ দিন স্যারকে আর বাসায় ঢুকতে বা বের হতে দেখিনি। অনেকবার স্যারের নাম্বারে কল দিয়েছি। ধরেননি।
গত রাতে অনেক বার কলিং বেল টিপলাম।
কোন সাড়াশব্দ নেই। ফ্ল্যাট অ‍্যাসোসিয়েশন এর সেক্রেটারি স্যারকে রাতেই বললাম। উনি বললেন যে হয়তো শশুড় বাড়ি গিয়ে থাকতে পারেন।
এখন আবার ফোন বন্ধ পাচ্ছি।
আমার কাছে ব্যাপারটা ভালো লাগছে না ম্যাডাম!
গত কয়েকটা দিন ওনাকে খুবই অসুস্থ দেখাচ্ছিলো! আপনি কি কিছু জানেন? একটু আসবেন ম্যাডাম!
জিনিয়া বললো,
: ঠিক আছে। আমি কল দিয়ে দেখছি। তুমি চিন্তা করোনা! দরকার হলে আসবো! বলে লাইনটা কেটে দিয়েই ইয়ামিনকে কল দিলেন। নাম্বারটা বন্ধ।
বারবার কল দিয়েও একই রেজাল্ট পেলেন।
রাহুলের গলার শব্দে চমকে উঠলেন!
কখন যেন ওর ঘুম ভেঙ্গে গেছে!
হয়তো কথাবার্তার শব্দে!
: মা, আমরা কি ধানমন্ডি যাচ্ছি?
রাহুলের কন্ঠস্বর শুনে জিনিয়া কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন,
: হুম। যাচ্ছি। চলো রেডি হই!
রাহুল খুশিতে একটা চিৎকার দিয়ে উঠলো!
বলতে থাকলো,
: কি মজা, কি মজা! বাবার কাছে যাবো!
বাবার সাথে খেলবো! আমি আর এখানে আসবো না!
জিনিয়া ছেলের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।
ভাবলেন, রাহুলকে তার শ্রেষ্ঠ খেলার সঙ্গী বাবার কাছ থেকে আলাদা করে রাখাটা ঠিক হয়নি।
এবার অন্তত দুই তিন দিনের জন্য রেখে আসতে হবে। বললেন,
: বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও! আমি এই ফাঁকে তোমার কাপড় চোপড় গুলো গুছিয়ে নিচ্ছি।
:
সকাল সাতটা। এতো সকালে ড্রাইভার আসে না।
তাই ছেলেকে নিয়ে বের হয়ে একটা রিকশা নিলেন।
রাহুলকে একটা নীল রঙের সোয়েটার পরিয়ে দিয়েছেন। একটা অ‍্যানজেলের মতো দেখাচ্ছে ওকে। নিজে পরেছেন একটা কালো রঙের শাল।
তবুও রিকশায় বসে ঠান্ডায় কাঁপুনি ধরে গেল।
কোন জ্যাম নেই। শুধু কিছু নারী পুরুষ মর্নিং ওয়াক করছে রাস্তায়।
দশ মিনিটেই পৌঁছে গেলেন বাসায়।
খুবই চিন্তিত মুখে গেটের পাশে দাঁড়িয়েছিল টুটুল।
তিন জন একসাথেই তিনতলায় উঠে এলেন।
জিনিয়ার কাছে সবসময় ফ্ল্যাটের একটা চাবি থাকে। ওইটা দিয়েই দরোজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন।
ভ্যাপসা একটা গন্ধ এসে নাকে বাড়ি দিলো।
দীর্ঘসময় ঘর বন্ধ থাকলে এরকম হয়।
ড্রইং রুমে ঢুকেই লাইটগুলো জ্বালিয়ে দিলেন।
বড়সড় রুমটার একটা কর্নারের ফ্যান ছেড়ে দিলেন। গন্ধটা বেরিয়ে যাক!
মাস্টার বেডরুমের দরোজা বন্ধ দেখা যাচ্ছে।
জিনিয়া এবার সত্যি সত্যিই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন।
ইয়ামিন কি কিছুই টের পায়নি!
আস্তে আস্তে ইয়েল লকে মোচড় দিয়ে বেডরুমের দরোজাটা খুলে ফেললেন।
:
ভকভক করে একটা তীব্র পঁচা দুর্গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা দিলো। পুরো বাড়িটাই ভরে গেল ওই অসহ‍্য পঁচা গন্ধে। জিনিয়া নাকে শাল চেপে ধরে ভেতরে একবার উঁকি দিয়েই বুঝে গেলেন। চিৎকার করে কাঁদতে গিয়েও থেমে গেলেন। দরোজাটা টেনে বন্ধ করে দিয়ে টুটুলকে ফ্যাসফেসে গলায় বললেন,
: ওকে বাইরে নিয়ে যাও!
টুটুলও বুঝে গেছে। তাই কথা না বাড়িয়ে রাহুলের হাত ধরে টেনে বাইরে নিয়ে গেল।
ওরা যাবার পর জিনিয়া আবার দরোজাটা খুলে ভেতরে ঢুকলেন। নাকে শাল চেপে ধরার পরেও দুর্গন্ধটা শরীরের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ছে।
বিছানায় শুয়ে আছে একটা লাশ।
জামা, পাজামা না থাকলে বোঝাই যেতো না এটা কার লাশ। ছোট ছোট পোকা কিলবিল করছে পুরো শরীর জুড়ে। মুখের মাংস পুরোটাই খেয়ে ফেলেছে।
শরীরও শেষ। কিছু কিছু জায়গায় জামার কাপড়গুলোও খাওয়া শেষ।
বিভৎস দৃশ্য! বোঝাই যাচ্ছে, কয়েকদিন আগেই মরে গেছে ইয়ামিন। দুর থেকে দেখলে মনে হতো একটা মানুষ বালিশে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে।
ঘটনার আকস্মিকতায়, বিভৎসতায় বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন জিনিয়া। বেডরুম থেকে বেরিয়ে এসে একটানে দরোজাটা বন্ধ করে দিলেন। দৌড়ে কমন টয়লেটে ঢুকে বেসিনে বমি করতে শুরু করলেন। একটানা অনেকক্ষণ ধরে বমি হলো।
মনে হচ্ছে, শরীরের ভেতরে যা কিছু আছে, সবই বেরিয়ে যাবে। একসময় নিস্তেজ শরীর নিয়ে ড্রইং রুমে এসে একটা সোফায় বসে পড়লেন।
ভীষণ কষ্ট নিয়ে ঘরটির চারদিকে চেয়ে চেয়ে দেখছেন। তার নিজের পছন্দে কেনা জিনিসপত্র দিয়ে সাজানো ঘর। ইয়ামিন তার পছন্দকে খুব অ‍্যাপ্রিশিয়েট করতো। কত মায়া, কত স্মৃতি!
হঠাৎ চোখে পড়লো, সেন্টার টেবিলের ওপর একটা খাম পরে আছে। অ‍্যাসট্রে দিয়ে চাপা দেয়া।
জিনিয়া খুবই কষ্ট করে উঠে খামটা নিয়ে আবার সোফায় এসে বসলেন।
:
খামের ওপর লেখা তার নাম, জিনিয়া।
আস্তে আস্তে খামটা খুললেন।
বেশ কয়েক পাতায় লেখা চিঠি। ইয়ামিনের লেখা।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে সম্মোহিতের মতো পড়তে শুরু করলেন।
:
প্রিয় জিনিয়া,
কয়েকদিন ধরেই কিছু লিখতে ইচ্ছে করছে।
তাই এই চিঠি। তবে, আমি জানি, এটা কখনোই পোস্ট করা হবে না। তুমি চলে এলে হয়তোবা এটা লুকিয়ে ফেলবো। ছিঁড়ে ফেলবো।
তবুও লিখছি।
আসলে আমার আর কিছুই করার নেই।
মনের শক্তি হারিয়েছি অনেক আগেই।
কথা বলার শক্তিও আর নেই।
ইদানিং শরীরের শক্তিটাও হারিয়ে ফেলছি।
ভয় হচ্ছে, লেখাটা শেষ করতে পারবো তো!
:
আমার ব্যবসাটা ধ্বংস হয়ে গেছে।
বহু কষ্টে গড়ে তুলেছিলাম।
নামে এক্সপোর্ট ইমপোর্ট হলেও আমি মূলত ইমপোর্ট করতাম।
একটা সময় গেছে, যাই ইমপোর্ট করেছি, লাভ হয়েছে। সময় বদলে গেছে। সাধারণ জিনিস এনে লাভ করাটা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে।
সবাই বলে, এখন হচ্ছে ইনফরমেশন টেকনোলজির যুগ। ব্যবসা করলে এই লাইনেই করতে হবে।
তাই রিস্ক নিয়ে বিদেশি একটা গ্ৰুপের সাথে ইনভেস্টমেন্টে গেলাম। ওরা আমার পুরো ক্যাপিটেলটাই মেরে দিয়েছে। আমি আক্ষরিক অর্থেই এখন জিরো হয়ে গেছি।
:
তারপরও ছোটখাটো কিছু করে হাল ধরার চেষ্টা করেছি। কাজ হয়নি। আসলে আমার গোল্ডেন টাইমটা শেষ হয়ে গেছে! সবকিছুরই একটা শেষ আছে। আমি এভাবে শেষ হবো, ভাবতেই পারিনি।
আমার ব্যবসায়িক শুভানুধ্যায়ীরা কেটে পড়েছে।
মন ভেঙ্গে গেছে। তাই অফিসের পরও বসে বসে ভাবি, আর কিছু করার আছে কিনা! আসলে ঝিম মেরে বসে থাকি।
অলস সব চিন্তা ভাবনা। এগুলো দিয়ে ব্যবসা চলে না। ফ্ল্যাটটা বিক্রি করে আবার একটা চেষ্টা করতে পারতাম। কিন্তু মন সায় দেয়নি। এখানে তোমার এবং রাহুলের ভবিষ্যৎ জড়িত।
উল্টোপাল্টা কিছু হয়ে গেলে একেবারে রাস্তায় দাঁড়াতে হবে। তাই আর কোন ঝুঁকি নেয়া সম্ভব নয়।
এসব হতাশার কথা কিভাবে তোমার সঙ্গে শেয়ার করবো, হাজার ভেবেও কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারছিলাম না।
:
তুমি স্বভাবতই কৌতুহলী হয়ে উঠলে।
মাঝে মাঝেই আমার ফোন কল এবং মেসেজ গুলো চেক করা শুরু করে দিলে। এগুলো করতে আমি ঘুমোবার পর। আমার মনের এই অবস্থায় আসলে কি ঘুম হয়! তাই সবই টের পেতাম।
এসব নিয়ে আমি কখনোই চিন্তা করিনি।
কারন, তোমাকে পেয়ে আমার জীবন ছিল পরিপূর্ণ।
কখনো কোন কাঁটা বিছানো পথে পা বাড়াবার কথা স্বপ্নেও ভাবিনি। তাছাড়া, তোমার এসব আচরণতো আমার প্রতি তোমার গভীর ভালোবাসাই প্রকাশ করে। ভালোবাসার মানুষটির প্রতি সন্দেহ থাকতেই পারে। এটাই স্বাভাবিক। ভেবেছিলাম, একসময় হয়তোবা সব কিছুই তোমাকে খুলে বলতে পারবো।
অভিমান যে হয়নি, তা নয়। যে গভীর ভালোবাসা এবং বিশ্বাস নিয়ে আমরা জীবন শুরু করেছি, সেটা এতো তাড়াতাড়ি হারিয়ে গেল!
:
ছোটবেলা থেকেই আমি খুবই অভিমানী!
মা আমাকে গল্প বলে ঘুম পাড়াতেন। একদিন আমার খালা বেড়াতে এসেছে আমাদের বাসায়।
রাত এগারোটা বেজে গেছে। তাই মার কাছে গিয়ে হাত ধরে টানাটানি করছিলাম, ঘুম পাড়িয়ে দেবার জন্য। মা তখন খালার সঙ্গে গল্পে মশগুল।
আমাকে হঠাৎ করেই খুব ধমকে উঠলেন।
কড়া দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
: বড়দের কথার মাঝে বিরক্ত করছো কেন?
যাও এখান থেকে! খালার সামনে এত বড় অপমান!
আমি কান্না চেপে আমার ঘরে এসে শুয়ে পড়লাম।
কিছুক্ষণ পর মা এসে আমার বিছানায় বসে মাথায় হাত বুলিয়ে গল্প শুরু করলেন। আমি তাকে থামিয়ে দিলাম। বললাম,
: আমি আর গল্প শুনবো না! এখন থেকে একা একাই ঘুমাবো! তুমি এখান থেকে যাও!
মা বারবার স্যরি বলছিলেন। অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলেন। কোন লাভ হলো না। আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল। ওই সিদ্ধান্ত আর কখনোই চেন্জ হয়নি।
এখন ভাবলে অবাক লাগে! কতোইবা বয়স ছিল আমার! বড়জোর ছয় কি সাত! ওই বয়সেই অভিমানের পাহাড় জমে যেত আমার মনে।
:
তিন বছর আগে হঠাৎ করেই আমার হার্ট অ্যাটাক হলো! ঘটনা সিরিয়াস হলেও বেঁচে গেলাম।
তুমি নিজে থেকেই আমাকে ওষুধ খাওয়ানোর সব দায়িত্ব নিয়ে নিলে।
আমি কিন্তু বারবার বারন করেছি তোমাকে। তুমি বেশ ইমোশনাল হয়ে জিজ্ঞেস করলে,
: আমার স্বামীকে আমি ওষুধ খাওয়াবো। এটাতে কার কি অসুবিধা! তাছাড়া, তুমি খুবই ভুলোমনা মানুষ। এখানে লাইভ সেভিং ড্রাগও আছে। ভুলে গেলে বিরাট অসুবিধা!
আমি তখন বললাম,
: এভাবে আমাকে অভ্যস্ত করে তুলোনা!
পরে কখনো যদি এই যত্নটা বন্ধ করে দাও, ভীষণ কষ্ট পাবো আমি!
তুমি খুবই আত্মবিশ্বাসী কন্ঠে বললে,
: আমি নিজের ব্যাপারে ভুল করতে পারি। কিন্তু তোমার ব্যাপারে আমার কখনোই ভুল হবে না!
এই ব্যাপারগুলো আমার ভালোবাসাকে কেবলই গভীর থেকে গভীরতর করেছে। আমি ছোটখাটো সব ব্যাপারে ক্রমশই তোমার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লাম। এবং জীবনের সবচাইতে বড় ভুল করলাম।
:
তুমি কি করে পারছো আমায় ছেড়ে থাকতে!
আমিতো নিজে সামান্য একটা রান্নাও করে খেতে পারিনা। চা বানাতে গিয়ে চাপাতা চিনি কিছু খুঁজে পাইনা। কিচেনে কোথায় কি আছে কিছুই জানি না।
একদিন সকালে চা ঢালতে গিয়ে হাত পুড়িয়ে ফেললাম। ব্যস, আর চেষ্টা করিনি।
মধ‍্যবয়সী কাজের বুয়া। তুমি নেই। তাই তাকেও আসতে নিষেধ করে দিয়েছি। প্রতিবেশীরা খারাপ ভাবতে পারে।
:
খুব ক্ষিদে লাগলে কোন একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে খেয়ে আসি। বিচ্ছিরি সব খাবার! আর খেতে ইচ্ছে করে না! এর চেয়ে না খেয়ে থাকাই ভালো!
কখনো কখনো রাহুলের খেলনাগুলো নিয়ে বসি।
একা একাই খেলি। বেশ সময় কেটে যায়।
ওকে ভীষণ মিস করি! ভাবছি, মাঝে মাঝে রাহুলকে নিয়ে আসবো। কিন্তু কিভাবে!
আমিতো নিজের যত্নই নিতে পারিনা। ওকে কিভাবে দেখে রাখবো!
ওষুধের বক্সটা অনেক কষ্টে খুঁজে পেয়েছি!
মনে পড়লে মাঝে মাঝে খাই। হঠাৎ বুকে ব্যাথা হলে ছোট যে ওষুধটা জিহ্বার নীচে দিতে হয়, সেটা প্রায় প্রতিদিনই দিতে হচ্ছে। হয়তো দুয়েক দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। তখন হয়তোবা আমিও শেষ হয়ে যাবো। তাছাড়া, ইনহেলারটাও শেষ।
এগুলো আমি আর কিনবো না। গত কয়েক বছর ধরে তুমিই তো কিনেছো!
:
আমার ভালোবাসার মানুষ, যত্ন নেবার মানুষ চলে গেছে। যত্নহীন ভালোবাসা বেঁচে থাকে না। তাই আমার আর বেঁচে থাকার প্রয়োজন আছে কি!
তুমিতো জানোই, আমি খুবই অভিমানী!
অভিমান নিয়েই হয়তো যেকোন সময় চলে যাবো।
:
খাপছাড়া সব লেখা! ক’দিন ধরেই লিখছি।
শেষ করতে পারছিনা। শরীর দুর্বল হয়ে গেছে।
আজকে আর লেখার শক্তিও পাচ্ছি না।
মনে হচ্ছে, আমার সময় শেষ হয়ে আসছে।
আমি আর বিছানা থেকে নামবো না!
নামলে হয়তো আর উঠতে পারবনা।
তোমার চুলের গন্ধ লেগে আছে তোমার বালিশে।
আমি ওই বালিশেই মাথা রেখে শুয়ে থাকি।
ওই বালিশে মাথা রেখেই মরতে চাই!
একটা অনুরোধ, রাহুলকে আমার পঁচা গলা লাশ দেখতে দিওনা! থাকলাম নাহয় ওর কাছে চিরতরুণ বাবা হয়ে! খেলার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী পার্টনার হয়ে!
আমি একজন ব্যর্থ মানুষ।
আমাকে ক্ষমা করে দিও!
ইয়ামিন
:
পুলিশের গাড়ির সাইরেন, অনেক মানুষের হৈচৈ এর শব্দ, দরোজা খোলার শব্দ, রাহুলের ডাকাডাকি, সবই টের পাচ্ছেন জিনিয়া। কিন্তু কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না।
চোখ একসমুদ্র জলে ভিজে আছে।
:
লেখা: আবদুল জাববার খান

Facebook Comments

About Priyo Golpo

Check Also

Bangla Best golpo Boltu k niya - Boltu is Rocks

বল্টু সমাচার

শপিং মল থেকে উচ্ছসিত মুখে বেরিয়ে এলো ওরা। মেয়েটা হাসিমুখে হাঁটতে হাঁটতে তার ওড়না সামলাতে …

error: Content is protected !!