Home / অনুপ্রেরণা / ফ্যামিলি ক্যু

ফ্যামিলি ক্যু

তোমার যা খুশি করতে পারো! সংসার করতে ভালো না লাগলে ডিরেক্ট বলে দাও! আমি এখন আর এগুলোর ধার ধারি না! আমরা তিন বান্ধবী মিলে কোলকাতায় যাবোই! টিকিট বুক করা হয়ে গেছে।
আমি একটা ডাইনিং চেয়ারে বসা।

ডাইনিং টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে রনরঙ্গিনি চেহারা নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন আমার স্ত্রী।
তাকে দেখে এখন আমার কাছে দিল্লির প্রথম মহিলা বাদশাহ যোদ্ধা রাজিয়া সুলতানা বলে মনে হচ্ছে।
অথচ, বিয়ের পর থেকে বছরের পর বছর আমি তাকে বিদুষী বেগম রোকেয়ার ইমেজে দেখেছি।

বিদুষী বটে! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্স, মাস্টার্স করা ছাত্রী। গভীর শান্ত মেজাজের মানুষ! আমি তার এই যুদ্ধংদেহী মনোভাব দেখে খানিকটা বিচলিত। বললাম,
: আমার পারমিশন নাওনি কেন? আমি চাইনা, আমাকে ছাড়া বিদেশে গিয়ে তুমি কোন সমস্যায় পড়ো! সুতরাং এই ট্যুর বাদ! বলে কাঁধ ঝাকা দিয়ে বুঝিয়ে দিলাম, আলোচনা শেষ।

কিন্তু আসলে শেষ হয়নি। ওটা ছিল শুরু।
রাজিয়া সুলতানা অর্থাৎ সুমি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো। বললো,
: আমি এতদিন সব সহ্য করেছি।
আর না! আর এটা তোমার অফিস না। এখানে তুমি কোন কোম্পানির এমডি না। কাঁধ ঝাঁকিয়ে কি বোঝাতে চাও?

যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।
আমিও মানসিক প্রস্তুতি নিলাম। কঠিন হবার প্রস্তুতি। এসব ঘটনা অ্যালাউ করলে শাসন ব্যবস্থা বলে কিছু আর থাকবে না। বাঘের মতো গর্জে উঠলাম। বললাম,
: ফাইজলামি শুরু করছো? কি বোঝাতে চাও আমাকে? আই এম এ সেলফ্ মেইড ম্যান। কারো পরোয়া করি না আমি! দরকার হলে ডাকো তোমার ফ্যামিলির সবাইকে! নিজেদের মেয়েকে বুঝে নিয়ে যাক! নিজের দেয়া কড়া ডোজে আমি নিজেই মুগ্ধ হয়ে গেলাম।

ঠাস করে মেয়েদের বেডরুমের দরোজা খুলে বড় মেয়ে বেরিয়ে এলো।
বাদশাহ রাজিয়া সুলতানার প্রধান সেনাপতি।
আরো বেশি কঠিন এবং দক্ষ যোদ্ধা।

এসে আমার মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসলো।
হাসি হাসি মুখ করে বললো,
: কি হয়েছে বাবা? প্রশ্নের ধরনে মনে হচ্ছে যেন একটা গল্প শুনতে চাচ্ছে।

আমার মেয়েকে আমি চিনি। সতর্ক হয়ে গেলাম।
ওর বেশি শান্ত মুখভঙ্গি বলে দিচ্ছে, সব কথাই সে জানে। তাই বললাম,
: তোর মা’কে জিগ্যেস কর!
বড় মেয়ে ওয়ামিয়া তার মায়ের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো।
মা কিন্তু মেয়ের মতো এতোটা ডিপ্লোম্যাটিক বুদ্ধি শিখে উঠতে পারেনি। ফট করে বলে বসলো,
: দেখলি! আগেই বলেছিলাম না, এই লোক কিছুতেই পারমিশন দেবে না!
আমি রাগী দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকালাম। বুঝিয়ে দিলাম যে তোমরা নাটকটা করে ভালো করছো না।
মেয়ে তার মায়ের কথার ভুলে কিছুটা বিব্রত। কড়া দৃষ্টি দিয়ে মাকে ভর্ৎসনা করলো।
বললো,
: বাবা, বিশ্বাস করো, এতো ডিটেইল কিছু জানিনা।

তবে তুমি মাকে তার বান্ধবীদের সাথে যেতে দিলে কি হয়? আমাকেতো বান্ধবীদের সাথে শ্রীমঙ্গল যেতে দিয়েছো! কক্সবাজারেও যেতে দিয়েছো!
তাহলে মা কি দোষ করলো?
প্রধান সেনাপতির চমৎকার পারফরম্যান্স দেখে মা অনেকটাই নিশ্চিন্ত হয়ে এতোক্ষণে একটা চেয়ার টেনে বসলো।

আমার পজিশন স্বভাবতই দুর্বল হয়ে গেছে। প্রধান সেনাপতির আগমনেই ওদের টিম স্পিরিট এখন তুঙ্গে। ছোট মেয়ে ভেতরে আছে রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে। ছোটটা, অর্থাৎ অরিন এমনিতে বড়টার মতো এতোটা কৌশলী না। খুবই শান্ত স্বভাবের। বেশি কিছু বললেই কেঁদে দেয়। আর এটাই ওদের টিমের সবচাইতে ভয়ংকর অস্ত্র। অ্যাটম বোমা।

ওরা ভালো করেই জানে, কোন মেয়ের কান্নাই বাবা সহ্য করতে পারবে না। তাই প্রয়োজনমতো ব্যবহারের জন্য ওই উইপনটা রিজার্ভ রেখেছে।
আমি কম্প্রোমাইজের সুরে মেয়েকে বললাম,
: তোমরা এটাকে পারমিশন নেয়া বলছো কি হিসেবে? সব কিছু ঠিক করে রেখেছে। তাহলে পারমিশন নেবার বাকি আছে কিছু?
ওয়ামিয়া তার মায়ের দিকে তাকিয়ে আমার জন্য শান্তনা সূচক কিছু কথা বললো,
: মা, বাবাতো ঠিকই বলেছে। তুমি সব কিছু ঠিক করার আগে একটু কথা বলে নিলেই হতো!
আমার স্ত্রী তার অবস্থানে অটল। বললো,
: আগে বললে এই লোক কিছুতেই পারমিশন দিতো না। বরং প্যাঁচ লাগিয়ে দিতো!
ওয়ামিয়া আবারো বিব্রত। বললো,
: বাবা, প্লীজ! এবারের মতো যেতে দাও! ঘুরে আসুক! ঝামেলায় পরলে নিজেই সব বুঝতে পারবে!
আমি পরাজিত। তাই আর কথা না বলে শুধু মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিলাম।

আমার কিছু উপলব্ধি শেয়ার করছি।
কেউ যখন মেয়ের মা হয়, তার মধ্যে বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটে।
খুবই বেশি গিন্নী গিন্নী ভাব চলে আসে। কন্যা বড় হলে সবকিছুতেই মা’কে সাপোর্ট করে।😪
আর যেটা ঘটে, মায়ের বয়স যতো বাড়ে, চেহারা ততোই সুন্দর হতে থাকে। সুন্দরের একটা আলাদা পাওয়ার আছে। এই পাওয়ারের ঝাল এখন আমি হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি।
মেয়েদের মধ্যস্থতায় বউয়ের সাথে সন্ধি করতে বাধ্য হয়েছি। যুদ্ধে পরাজিত জার্মানদের মতো সব শর্তে।
বাকি জিন্দেগি বউকে কখনোই ঝাড়ি মারা চলবে না।
বাঘের মতো আচরণ করা যাবে না। বিড়াল হয়েই থাকতে হবে।
কি আর করা! থাকলাম নাহয় এভাবেই।

আমার রাতজাগা স্বভাব। রাতে আমি যখন বেডে যাই, সুমি প্রায়ই ঘুমিয়ে থাকে। ঘুমন্ত সুমির দিকে আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি। ভাবতে থাকি, কতোটা ভাগ্যবান হলে এতো সুন্দর, এতো ভালো একটা বউ কপালে জোটে! তার জীবনের সবটুকু প্রায়োরিটি হলো তিন সন্তান ও স্বামী।
আলহামদুলিল্লাহ!

-লেখাঃ আবদুল জাববার খান

Facebook Comments

About Priyo Golpo

Check Also

পোষ্টটি সকলের পড়া প্রয়োজন। আপনি সুখি এবং সফল হবেন।

ব্যক্তিগতভাবে মিনিমাল লাইফ লিড করতে চাই। ডিসট্রাকটন কমে, কাজ অনেক দ্রুত হয়। আমরা যারা নেট/পিসিতে …

error: Content is protected !!