Home / গল্প / দালাল
dalal, গরুর দালাল Magir dalal আজকাল সবখানেই দালাল। চলে প্রতারণা চক্র ও টাকা খাওয়ার ধান্ধা।
DALAL, Writer Abdul Zabbar Khan

দালাল

রশীদ পাটোয়ারী।

টঙ্গী এলাকার বিখ্যাত জমির দালাল।

একসময় কিছুদিন একটা টেক্সটাইল মিলে লেবার হিসেবে কাজ করেছেন। ট্রেড ইউনিয়নের কারনে দুচারজন লেবার লিডারের সাথে পরিচয় ছিল।
এক আধবার নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মন্ত্রীর বাসায় যাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। পরবর্তীতে বেশি বড় নেতা সাজতে গিয়ে চাকরিটাই চলে যায়।
অবশ‍্য এরিমধ্যে যথেষ্ট পরিচিতি পেয়ে যান তিনি।
ভীষণ চালু মানুষ! সকাল বিকাল কথা বদলাতে একটুও দ্বিধা হয় না তার।
একবার টঙ্গী থেকে আমার এলিফ্যান্ট রোডের অফিসে ক্লায়েন্ট নিয়ে আসার কথা। আমি সকাল এগারোটা থেকে অপেক্ষায় আছি। চারটার দিকে উনি ল্যান্ড ফোনে কল দিলেন। আমি খুবই উত্তেজিত হয়ে বললাম,
: আমার মতো একটা মানুষকে শুধু শুধু সকাল থেকে বসিয়ে রাখলেন! এটা কি ঠিক হলো!
রশীদ সাহেব এসব উত্তেজনার ধারে কাছেও গেলেন না। উনি ফোনে বললেন,
: ভাই, আমিতো এইটাই বলতেছি ওনাদের। ওনাগো অফিসেই বইসা আছি।
আমার মতো একজন লেবার লিডাররে তিন চাইর ঘন্টা ধইরা বসায়া রাখছে। কাজটা কি ঠিক করতেছে! আপনেই কন!
আমি যে কতটা বিরক্ত, রশীদ এসব কথার কাছেই গেল না। সে তার দাম বাড়াতেই ব্যস্ত।
কথায় কথায় ভাব ধরেন আর বলেন,
: আমি হইলাম গিয়া পাটোয়ারী বংশের লোক, হেন তেন….! একদিন খুব বিরক্ত হয়েই বলেছিলাম,
: এতো যে পাটোয়ারী পাটোয়ারী করেন! এটার মানে কি?
রশীদ পাটোয়ারী ব্যথিত চোখে আমার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। কোন জবাব দিলেন না।
এই মুহূর্তে তিনি গাজীপুর কোর্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন । বেশি উত্তেজনায় তাকে একটু চিন্তিত মনে হচ্ছে। গায়ের রং কালচে শ্যামলা। পরনে ধবধবে ফুল স্লিভ সাদা শার্ট। সম্ভবত পলিস্টার কাপড়ের হবে। চকচকে ইস্তিরি করা ভাঁজ দেখে তাই মনে হচ্ছে। শার্টের বোতাম প্রায় গলা পর্যন্ত লাগানো। ভাব দেখে মনে হচ্ছে, জাস্ট টাইটা পড়তে ভুলে গেছেন।
তেল মাখানো চুলে খুব সুন্দর করে সিঁথি করা।
অবশ্য মাথায় চুলের পরিমাণ বেশ কমে গেছে।
চুলের তেলের প্রভাবে মুখটাও একটু শাইন করছে।
সাদা একটা লুঙ্গি পরেছেন। একটু ময়লা হয়ে গেছে। পায়ে পালিশ করা কুচকুচে কালো জুতা। খুব পান খাওয়ার নেশা। আধা ঘন্টা পর পর নতুন করে পান মুখে দেয়। তার পোশাক আশাক মোটামুটি এরকমই থাকে।
গ্ৰাম‍্য মাতব্বরদের মতো হাবভাব। চাপার জোরে মানুষ বশ করার কায়দাটা খুবই ভালো জানেন।
সকাল থেকেই আমরা অর্থাৎ রশীদ, আমি আর আমার ছোট ভাই সানু কোর্টের বারান্দা আর ক্যান্টিনে অবস্থান নিয়েছি। ক্লায়েন্টদের সাথে বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথাবার্তা চলছে। টায়ার্ড হয়ে গেলে ক্যান্টিনে বসে চা খাই। আবার বারান্দায় যাই। এভাবেই চলছে।
টাকা পেতে পারি। তাই ব্যাপারটা বিরক্তিকর হলেও উত্তেজনাও কম নয়। আহ্…. টাকা! কয়েক মাস ধরে চেষ্টার পর আজকে হয়তো সফল হবো!
আমার ধারণা, সাকসেস আরো আগেই আসতো।
কিন্তু রশীদ পাটোয়ারী বাড়াবাড়ি রকমের মিথ্যাবাদী। তাই বারবার ব্যর্থ হচ্ছি! মুখের ওপর অবলীলায় অনর্গল মিথ্যা বলেন তিনি। চাপা মারার ডোজ বেশি হবার কারনে ইতোমধ্যেই কিছু ক্লায়েন্ট হাতছাড়া হয়ে গেছে। জমির লাইনে চাপা চলে না।
ফ্যাক্টস নিয়ে কাজ করতে হয়। কারন, সবকিছুই ডকুমেন্টেড। ধরা পড়ে যায়।
আজকে তাকে অনেক কষ্টে রাজী করিয়েছি, মিথ্যা কম বলার জন্য। একটা গ্ৰুপ মিলে আমার জমিটা কিনবে। দলের সবাই এসে গেছে আগেই। লিডার এখনো আসেনি। রশীদই সব ম্যানেজ করেছে।
সে লোকাল লোক। জমি থেকে শুরু করে সব মানুষকেই চেনে। দেখাদেখির পর্ব শেষ।
আজকে শুধু টাকা দিয়ে রেজিস্ট্রেশন নেবে।
লিডার ক্লায়েন্ট এসে গেছেন। একটা স্কুটার থেকে নেমে ভাড়া মেটাচ্ছেন। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সাড়ে এগারোটা বাজে।
রশীদ সাহেব একটু এগিয়ে গিয়ে লিডার কে রিসিভ করলেন। সামনে এসে আমাকে দেখিয়ে ওনাকে বললেন,
: ইনাকে চিনে রাখেন! কাজে লাগবে। কুডি কুডি ট্যাহার মালিক ইনারা! কয়েকশ বিঘা জমি আছে। বংশ পরম্পরায় ধনী। দশ বিশ মাইলের মইধ‍্যে ইনাগো সবাই চিনে। আপনেগো কপাল ভালো যে ইনাগো জমি কিনার সুযোগ পাইছেন! অথচ, এইরকম একজন কুডিপতিরে খাড়া রাইখা আপনে কিনা আইলেন দেরিতে! তাছাড়া, আমি পাটোয়ারী বংশের লোক। যেখানে সেখানে আমিও তো খাড়ায়া থাকতে পারিনা! আমিতো লজ্জায় আর ইনার সামনে মুখ দেখাইতে পারমু না!
শুদ্ধ অশুদ্ধ মিলিয়ে রশীদ সাহেব একগাদা মিথ্যা বলে দিলেন।
লিডার ভদ্রলোক নিতান্তই নিরীহ গোবেচারা মানুষ।
সরকারি চাকরিতে আছেন।
রশীদের কথায় ঘাবড়ে গিয়ে আমাকে জোরে একটা সালাম দিলেন।
আমি রশীদের কথার তোড়ে হতভম্ব! কোটি কোটি টাকার মালিক…! আমি…! অথচ, প্রকৃত অবস্থা এই যে আজকের ডীলটা না হলে আমি রীতিমত পথে বসে যাবো। ভাবছিলাম, একজন কোটিপতির কেমন ভাব ধরা উচিত! বলেই যখন ফেলেছে!
ভাবতে ভাবতেই একটু কায়দা করে হাত দুটো জিন্সের পকেটে ঢুকিয়ে ফেললাম। এই ভেবে যে হয়তো কোটিপতি কেউ আমার মতো করে টি শার্ট আর জিন্স পরে ঘুরে বেড়ায় না। পড়লেও হয়তোবা হাত পকেটের বাইরে রাখে না। রীতিমত বিব্রত অবস্থায় পড়ে গেলাম।
প্রাথমিক ধাক্কা সামলে লিডার ভদ্রলোক চোখ কুঁচকে আমার দিকে তাকালেন। বিরক্তির স্বরে বললেন,
: কোটিপতিরা তো জমি বিক্রি করে না। শুধু কেনে।
আপনি বিক্রি করছেন কেন?
আমি রশীদের দিকে কটমট করে তাকালাম। দেখি, সে নির্বিকার। ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে নার্ভাস ভঙ্গিতে বললাম,
: আপনি ঠিকই বলেছেন। আমরা মোটেই কোটিপতি নই। টাকা দরকার। তাই জমি বিক্রি করছি। মানুষ আমাদের সন্মান করে, এটা ঠিক। কারন, আমার দাদা এবং তার বাবা, দুজনেই ডাক্তার ছিলেন। ওই আমলে কেউ একজন মেট্রিক পাশ করলেও দূর দূরান্ত থেকে মানুষ তাকে দেখতে আসতো। আমাদের বাড়িটার নামও হয়ে গেছে ডাক্তার বাড়ি। আমার ধারণা, তারা ডাক্তার হলেও মানুষ হিসেবে বোকা ছিলেন। তাই টাকা গড়ে যেতে পারেননি। এবার কি আপনি আমাকে চিনতে পেরেছেন?
এবারে ভদ্রলোক নিজেই হতভম্ব হয়ে গেলেন।
আস্তে আস্তে ঘাড় নেড়ে বললেন,
: জী। আপনার দাদার কথা আমি অনেক শুনেছি। খুবই ভালো মানুষ হিসাবে ওনাদের নামডাক ছিল!
আমরা সত্যিই ভাগ‍্যবান যে আপনাদের জমি কেনার সুযোগ পেয়েছি। আর কোন কথা নেই।
চলুন, জমি রেজিস্ট্রেশনের কাজ শুরু করে দেই!
পূর্ব পুরুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতায় আমার চোখে পানি চলে এল।
রেজিস্ট্রেশন পর্ব শুরু। লিডার ক্লায়েন্ট জিজ্ঞেস করলেন,
: টাকা কাকে দেবো? আমি কিছু বলার আগেই রশীদ বলে উঠলো,
: এইগুলা কোন ব্যাপার না! দেন, আমারেই দেন! আমরাতো একই পার্টি।
বলেই টাকার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলো।
আমার তো মাথায় বাড়ি! রশীদের দিকে তাকিয়ে বললাম,
: তাহলে আপনিই জমিটা রেজিস্ট্রি করে দিয়েন!
আমি চলে যাই। রশীদ ঘাবড়ে গেল। কিন্তু সে ঠান্ডা মাথার প্লেয়ার। তেলতেলে কন্ঠে বলে উঠলো,
: ভাইজান বোধহয় আমারে ভুল বুঝলেন। সাত লাখ টাকা গুইনা নেওন লাগবো না! একলা কেমনে গুনবেন এত্তগুলা টাকা?
আমি দৃঢ় গলায় বললাম,
: অসুবিধা নাই। নিজেই গুনবো। বলে লিডারের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম। উনি একটা বড় সাইজের খাকি কাগজের খাম দিলেন। টাকা গুনতে শুরু করলাম। দেখলাম, রশীদ ক্রুদ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি আগেই দেখেছিলাম, বেশ কিছু বাড়তি লোকজন রশীদ কোর্ট প্রাঙ্গণে একটা জায়গায় জড়ো করে রেখেছে। একটু পর পরই তাদের কাছে গিয়ে চা নাস্তা খাওয়াচ্ছে।
টাকা গোনার কাজ শেষ হলে খামটা সানুর হাতে দিয়ে বললাম,
: সাবধানে রাখো! টয়লেটে গেলেও সাথে নিয়ে যাবা! সানু নির্বিকার ভাবে মাথা নাড়লো।
রশীদের মুখে একটা ধূর্ত হাসি খেলে গেল।
ওভার কনফিডেন্ট। দালাল বলেই ও জানে, এটা তারই কাজকর্মের আখড়া।
রেজিস্ট্রেশন শেষ হলেই থাবা দিয়ে টাকাগুলো নিয়ে নেবে। হয়তো তার প্রাপ্য পঞ্চাশ হাজারে সে সন্তুষ্ট নয়। বাড়তি আরো পঞ্চাশ হাজার রেখে বাকি টাকা আমাদেরকে দেবে। পুরোটা রাখবে না। কারন, তাকেও তো এলাকায় ফিরতে হবে।
এলাকায় আমাদের পারিবারিক প্রভাব সম্পর্কে সে খুব ভালোভাবে জানে।
দলিলে স্বাক্ষর পর্ব চলছে। সানু আমাদেরকে বলে টয়লেটে গেল। আমরা সাব রেজিস্ট্রারের রুমের দিকে এগিয়ে গেলাম।
সব শেষ হলে, ক্রেতারা বিদায় নিয়ে চলে গেল।
আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। রশীদকে বললাম,
: চলেন ভাই, চা খাই! রশীদ খুবই ঠাণ্ডা গলায় বললো,
: ভাইজান, টাকার ব্যাপারটা একটু ফয়সালা কইরা লই! আপনে তো জানেন, আমার হইলো গিয়া লোক লস্কর নিয়া চলাফেরা। খরচাপাতি এমনেই বেশি! এক লাখ রাইখা বাকি ছয় লাখ আপনেরে দিতাছি! যাওনের সময় ভাবী ছাহেবার লাইগা মিষ্টি কিনা লইয়া যাইয়েন! এই সময়টায় দেখলাম, রশীদের গুন্ডা পান্ডা গুলো আমাদেরকে মোটামুটি ঘিরে ফেলেছে। আমাকে আবার একটু আশ্বস্ত করলো,
: লোকজন দেইখা ডরাইয়েন না! আমি একজন নেতা মানুষ। মানুষজন ছাড়া চলতে পারিনা! কথা বলতে বলতে পকেট থেকে ডিব্বা বের করে একটা টাটকা পান মুখে দিলো। আয়েশ করে চিবুতে চিবুতে বললো,
: অন্য কেউ হইলে আরো বেশি রাখতাম। আপনেগো কাছ থাইকা কি বেশি নেওন যায়! বলে আমার দিকে তাকিয়ে আবার সেই ধূর্ত হাসিটা দিলো। আমি তার চোখে চোখ রেখে গল্প করার ভঙ্গিতে বললাম,
: রশীদ ভাই, এক আল্লাহ্ ছাড়া কাউকে ভয় পাইনা! লোকজন এনে আপনার লস হয়েছে। প্রাপ‍্য পঞ্চাশ হাজারের বেশি একটা টাকাও আমি দেবো না! আর আপনার এই পঞ্চাশ হাজারও আপনাকে ঢাকায় আমার অফিস থেকে নিতে হবে। চাইলে কাল সকালেই আসতে পারেন! রশীদ হা হা হা করে হেসে উঠলো। বললো,
: ভাইজান, আপনে হইলেন গিয়া শিক্ষিত লোক।
বিপদ বুঝতেছেন না। এতো লোক থুইয়া আপনে টাকা লইয়া যাইবেন কেমনে? বলে সে হাসিমুখে তার সাঙ্গপাঙ্গদের দিকে তাকালো। আমি কঠিন কন্ঠে বললাম,
: সেই চিন্তা আপনাকে করতে হবে না। টাকা এতোক্ষণে ঢাকার পথে প্রায় অর্ধেকটা চলে গেছে।
রশীদের মুখের হাসি গায়েব হয়ে গেল।
প্রায় আর্তনাদের স্বরে বললো,
: সানু ভাই কই? তোরা দেখতো! আমি বললাম,
: কষ্ট করে লাভ নেই। সানু রেজিস্ট্রেশনের আগেই রওনা দিয়েছে। হয়তো চলেও গেছে। আগেই নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলাম। বলার পর এবার আমি একটা নুরানী হাসি দিলাম।
মূহুর্তেই রশীদের মতো বাঘ একটা বিড়াল হয়ে গেল। বুঝে গেছে, আমাকে আর ঘাঁটানো যাবে না।   টাকাটা এখন ঢাকা থেকেই রিসিভ করতে হবে।
লেখা: আবদুল জাববার খান

Facebook Comments

About Priyo Golpo

Check Also

Bangla Best golpo Boltu k niya - Boltu is Rocks

বল্টু সমাচার

শপিং মল থেকে উচ্ছসিত মুখে বেরিয়ে এলো ওরা। মেয়েটা হাসিমুখে হাঁটতে হাঁটতে তার ওড়না সামলাতে …

error: Content is protected !!