Home / গল্প / কমরেড শায়লা

কমরেড শায়লা

০১.০২.২০১৯
আজ, বিবাহের পূর্বদিন, পার্লারে গিয়ে মাথা ন্যাড়া করে এসেছি। আম্মা দরজা খুলে আমাকে দেখে “হায় আল্লাহ” বলে সাময়িক জ্ঞান হারালেন। ভাবি দৌড়ে এসে জাপটে ধরলেন আম্মাকে।

আমি শার্টের কলারের কাছাকাছি জমে থাকা কুচো চুল ঝাড় দিতে দিতে ভাবলেশহীন কন্ঠে বললাম,আম্মাকে সোজা করে শুইয়ে ঠ্যাংয়ের নিচে একটা বালিশ দাও।

ভাবী কাঁদো কাদো হয়ে আমাকে বলল,শায়লা! তুমি এইটা কী করলা?
ভাবী বিলাপ শুরু করার আগেই আমি আমার শয়নকক্ষের দিকে হাঁটা দিলাম। নারী অধিকার, দেশ ও দশের চিন্তাভাবনা, পুরুষের কেন পৃথিবীতে থাকা উচিত না,মাথা ন্যাড়া করা কি শুধুই পুরুষের একান্ত ব্যক্তিগত অধিকার ইত্যাদি বিষয়াদি নিয়ে আজকে একটা গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট করতে হবে ফেসবুকে। পার্লারের মেয়েগুলো মাথা ন্যাড়া করতে চাইছিলনা। মাথা ন্যাড়ার উপকারিতা নিয়ে লেকচার দিতে হয়েছে এক ঘন্টা,মাথা ন্যাড়া করতে খরচ হয়েছে পনের মিনিট। নারীর জীবন ফেলনা নয়। প্রতিটা মিনিট অনেক গুরুত্বপূর্ণ । এদেরকে কে বোঝাবে? আমি ছাড়া?

আমি বোঝাব। হ্যা,আমি,ব্ল্যাকবেল্ট কমরেড শায়লা ইয়াসমিন। ফেসবুকের পুরুষ হটাও গ্রুপের এডমিন। আমাদের লক্ষ্য পৃথিবীতে পুরুষজাতির অস্তিত্ব বিনাশ করা। এই অস্তিত্ব বিনাশ শিল্পক্ষেত্রে,কৃষিক্ষেত্র,চিকিৎসা,গবেষনা সব জায়গায়। পুরুষ একটা বিশ্রি শব্দ। পৃথিবীতে পুরুষদের কাজ হলো শুধু নারীকে নির্যাতন করা । অথচ নারীরা দয়া করে পুরুষদেরকে এই পৃথিবীতে থাকতে দিয়েছে। কিন্তু আর নয়। সবকিছুর একটা শেষ আছে। আমাদের গ্রুপটায় এখন পাঁচ হাজার সদস্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গ্রুপের শাখা প্রশাখা বিস্তারের কাজ চলছে। সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন পৃথিবীতে থাকবে শুধু নারী আর নারী। ভাবতে ভাবতে আমার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।

আর সেই আমার কিনা একটা পুরুষের সাথে আগামীকাল বিবাহ! হাউ কাম? ভাবতে ভাবতে কান্না পেয়ে গেল আমার।
আব্বা বলেছে,হয় তুই এই ছেলেকে বিয়ে করবি নাহয় আমি সুইসাইড করব।
বলতে ভুলে গেছি একমাত্র আমার আব্বা ছাড়া পৃথিবীর সব পুরুষ খারাপ,এরা এক একটা মিশা সওদাগর। আমার ভাই? সেতো একটা বদের হাড্ডি। ছেলেবেলায় আমার গায়ে তেলাপোকা ছেড়ে দিত।
প্রথম প্রথম ভয় পেতাম। একদিন চোখমুখ শক্ত করে ওর ছেড়ে দেওয়া তেলাপোকা ধরে ফেলে ওর সামনেই টিপে মেরে ফেললাম। ভাইয়া তেলাপোকার নাড়িভুঁড়ি দেখে আমারই গায়ের উপর বমি করে ফেলল। কী এক বীভৎস অবস্থা। সে যাক!

কথা হলো আগামীকাল আমার বিবাহ। আব্বার ছেলেবেলার বন্ধুর ছেলের সাথে। বাংলা সিনেমা মনে হচ্ছেনা?
আমার হতচ্ছাড়া ভাইটা ছোটবেলায় মেলায় হারিয়ে গেলে রীতিমত একটা বাংলা সিনেমা হিসেবে চালিয়ে দেয়া যেত। কবে থেকে আশায় আছি কোন একদিন আব্বা ওকে ডেকে বলবে, তুই আমার আপন ছেলে না। ছোটবেলায় তোকে ডাস্টবিন হতে কুড়িয়ে পেয়েছিলাম! আহা সেদিন কী আর আসবে?

স্বীয় শয়নকক্ষের কাছাকাছি পৌঁছুতেই আমার ভাইয়ের সাথে দেখা। ফ্যাক ফ্যাক করে হেসে বলল,”তোকে জনি সিন্সের মত লাগছে। ”

নাহ আমি রাগিনি। খাম্বার সাথে কখনো রাগ করতে হয়না।
ভাইয়া আমাকে মেজাজ খারাপ করা কিছু বললেই ইদানীং আমি চোখ বন্ধ করে ভাবার চেষ্টা করি,সামনে দন্ডায়মান ব্যক্তিটি আসলে আমার ভাই না। সে একটা খাম্বা!
ওকে পাত্তা না দিয়ে ওর মুখের উপর ধড়াম করে দরজা লাগালাম। তারপর ল্যাপটপ কোলে নিয়ে আমি চিন্তামগ্ন হলাম।
বিয়েতে আমি বাধ্য হয়ে রাজি হয়েছি দুটো কারনে,এক.আব্বাকে আমি অনেক ভালবাসি,দুই. যে ছেমড়ার সাথে আমার বিবাহ ঠিক হয়েছে সে ঘোরতর নারী বিদ্বেষী। এর মাঝে গোপন ব্যাপার ক্লাস এইটে এই ছেলের সাথে আমি ক্রিকেট খেলেছিলাম। ক্রিকেট খেলতে যেয়ে কোন এক আশ্বিনের বিকেলে মেরে আমি ছেমড়ার নাক ফাটিয়ে দিয়েছিলাম। শুনেছি তারপর হতেই এই ছেলে জগতের কোন নারীকেই সহ্য করতে পারেনা। ছেলে পেশায় ডাক্তার। আমি আবার সাংবাদিক। এই নারী বিদ্বেষী ছেলেকে আমি বিবাহের পর কঠিন সাইজ করব। সাইজ করার ভিডিও আমার গ্রুপে আপলোড হবে। এই নারীবিদ্বেষী ছেলেরাই যুগে যুগে নারীদের নির্যাতন করে এসেছে। আমি ব্ল্যাকবেল্ট কমরেড শায়লা এদের সাইজ করার জন্য পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছি! জগতের বাকী নারীরা আমার কাছ হতে অনুপ্রেরণা পাবে। ভবিষ্যত নারী জাতির মুক্তি চিন্তায় আমার এই ক্ষুদ্র স্বামী বলিদান যুগ যুগ ব্যাপী স্মরিত হবে।
আজকের রাতে আমার আরেকটা মিশন আছে। মিশন বিয়ের জন্য কেনা পনের হাজার টাকা দামের শাড়িটা কাঁচি দিয়ে কুচিকুচি করে কাটা।
কাঁচি একটা জোগাড় হয়েছে। এই মুহূর্তে গ্রুপে বিপ্লব চলছে মেয়েরা কেন জিন্স টিশার্ট পরে বিবাহ করবেনা। কেন শাড়ি,গাউন পরতে হবে,অলংকার পড়ে, খোপায় ফুল দিয়ে জবড়জং পুতুল সাজতে হবে? বিপ্লবের অংশ হিসেবে মাথা ন্যাড়া করে এসেছি। এখন শাড়িটা কাটব। আমি আব্বার বিবাহের পাঞ্জাবীটা পড়ে বিবাহ করার প্ল্যান করছিলাম। আব্বা তাঁর বিয়ের পাঞ্জাবী পরিহিত ন্যাড়া মাথার আমাকে দেখলে স্ট্রোক করতে পারেন সেই টেনশনে আপাতত প্ল্যান বাদ দিয়েছি। টপস আর জিন্সই ভরসা এখন।
দেখা যাক কী হয় আগামীকাল।

০২/০২/২০১৯
আজ আমার আত্ম বলিদান তথা বিবাহ দিবস।
আমি ফেসবুকের “পুরুষ হটাও”গ্রুপে পোস্ট দিয়েছিলাম।
“কমরেড গন, বিবাহ আসরে কোনটি পরিধান উত্তম হবে? টপস জিন্স নাকি পাঞ্জাবী?”

অধিকাংশ সদস্য চাইছে আমি, গ্রুপ এডমিন কমরেড শায়লা, যেন পাঞ্জাবী পরিধান করেই বিবাহ কাজ সম্পন্ন করি! এ হবে এক অভিনব প্রতিবাদ!
সমস্যা হলো আমার আব্বা। বাড়িতে আত্মীয় স্বজন আসবে, লোকে কী বলবে এসব ব্যাপারে আব্বার চেয়ে আম্মারই সাধারনত বেশি মাথা ব্যথা থাকে। তারপরেও আমাকে পাঞ্জাবী পরিহিত অবস্থায় দেখলে আব্বা স্ট্রোক করতে পারে এই ভয়ে আমি এই পদক্ষেপ নিতে পারছিনা।
তবু কী ভেবে আজ সকাল দশটায় আব্বার রুম হতে আব্বার নীল রংয়ের একটা পাঞ্জাবী নিয়ে এসেছি। পাঞ্জাবী পরিধান করে এমনিতেই হালকা পাতলা ট্রায়াল দিচ্ছিলাম , সেই মুহূর্তেআম্মা রুমে ঢুকে আমাকে দেখলেন,তারপর “আল্লাহরে” বলে আরেকবার দাঁত কপাটি লেগে মূর্ছা গেলেন।

বাসা ভর্তি মেহমান। এত হৈচৈয়ের ভেতর মেঝো ফুপু আম্মার চিৎকার শুনে সোজা আমার রুমে ছুটে এলেন, ঢুকে আমাকে দেখে, “এ কী সর্বনাশ” বলে আম্মার পদ অনুসরন করতে যাচ্ছিলেন। তার আগেই আব্বা রুমে প্রবেশ করলেন। আমাকে দেখে গম্ভীর হয়ে গেলেন সাথে সাথে,
-মা, পাঞ্জাবীর সাথে লুঙ্গি পরবিনা? ষোল কলা পূর্ণ হতো?
এজন্যই বলছিলাম আমার আব্বা পৃথিবীর বাকি পুরুষদের চেয়ে আলাদা। আমি জানতাম আব্বা পুরুষ হওয়া সত্তেও এই বিপ্লবে আমার পাশেই থাকবেন। চোখ ভিজে গেল আমার! পৃথিবী কি জানবেনা এক মহান পুরুষও নারীদের বিপ্পবে শামিল হয়েছিল?

আম্মার চিল চিৎকার শোনা গেল!
-শাওনের আব্বা! কীসব বলছেন? পাঞ্জাবী লুঙ্গি পরে আমাদের মাথা ন্যাড়া মেয়ে বিয়ে করবে! কী বলেন এসব?
আব্বা বিড়বিড় করলেন। হালকা পাতলা বোঝা গেল আব্বা বলছেন, যে যেমন তার সাথে সেভাবেই চলতে হবে কিছু করার নাই।
এটা হলো আম্মাকে বুঝ দেওয়া কথা। জানি, মনে মনে আব্বা আমারই সাপোর্টার। আমার চোখ ভিজে এলো। আব্বাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে মন চাইছে।
এই মুহূর্তে এই পৃথিবীতে একজনই মহাপুরুষ আছেন। মানুষটা আমার আব্বা।

*

দুপুরে আমার শিষ্যা, আমার একান্ত অনুগত ফুফাত বোন নাজমা সর্বশেষ ভাঙচুর খবর তথা ব্রেকিং নিউজ দিল। আব্বা বাড়ির সবাইকে নির্দেশ দিয়েছেন বিয়ের আসরে কেউ যেন আমার ন্যাড়া মাথা আর পোশাক আশাক নিয়ে কথা না বলে,না হাসে।
আমার চোখে আবার পানি আসি আসি করছে। আব্বা এত ভাল কেন? আব্বা ছাড়া আমাকে কেউ বুঝে না।
আম্মা নাকি ঠিক করেছেন আমার সাথে এ জীবনে আর কথা বলবেন না। আমার তাতে কোন সমস্যা নেই। এর আগেও ভদ্রমহিলা দুইবার সারাজীবনের মত আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করেছিলেন।

যার সাথে আমার বিবাহ হতে যাচ্ছে, বজ্জাতটার নাম হাসান। তার নাকি ইচ্ছা স্বল্প পরিসরে,স্বল্প আয়োজনে বিবাহ হবে। এজন্য কমিউনিটি সেন্টারের বদলে আমাদের গ্যারাজকে সাজানো হয়েছে বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য।

এই মুহর্তে আমি মঞ্চে উপবিষ্ট হয়ে আছি। মেহমান বলতে আমাদের দুই পরিবারের নিকট আত্মীয় স্বজন। একটু পরপর এদের মাঝ হতে কেউ কেউ হা হুতাশ করছেন আমার রনাঙ্গিনী বেশ দেখে। কারো কারো চাপা হাসিও শোনা যাচ্ছে। আব্বার ভয়ে কেউ কিছু বলছেনা। আব্বাকে সবাই যমের মত ভয় পায়। নাজমা মুঠোফোন হাতে ঘুরঘুর করছে। সে ফেসবুক লাইভে আছে। গ্রুপের পাঁচ হাজার সদস্যা সরাসরি আজ আমার আত্ম বলিদান দেখবে। দেখে তারা প্রতিশোধস্পৃহায় মেতে উঠবে। আমাদের আন্দোলন বেগবান হবে। ভাবতে ভাবতে আমার চোখ টলমল করছে।

মঞ্চে আমাকে পাহারা দেয়ার জন্য ভাবীকে পাশে বসিয়ে রাখা হয়েছে। ভাবী থাকতে না পেরে একসময় আমাকে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল,পাঞ্জাবী পরে কেউ ন্যাড়া মাথায় বিয়ে করে! না একটু লিপস্টিক না একটু কিছু! মান সম্মান গেল আমার। বাপের বাড়িতে মুখ দেখাতে পারবনা। লাল ওড়নাটা প্লিজ মাথা থেকে নামায়োনা।
ভাইয়া পিছন থেকে বলল, পাঞ্জাবীর সাথে ম্যাচিং করা লাল ওড়না খারাপনা। থ্রিপিস মনে হচ্ছেতো! হা হাহা।

সম্ভবত আমাকে আজ সবার সামনে অপদস্থ হতে দেখে ভাইয়ার খুব আনন্দ হচ্ছে।
আমি যে এসবের তোয়াক্কা করিনা সেতো সে থোড়াই জানে।

অপেক্ষা করতে করতে একটু পরই আমি, ব্ল্যাকবেল্ট কমরেড শায়লার শিকার ইকবাল হাসান নামের ছেমড়া টা এলো। সবাই তাকে বরন করতে আগ বাড়িয়ে ছুটে গেলো। এবং সমস্বরে একটা শোরগোল শোনা গেল।
কে যেন বলে উঠল,এরকম কান্ড আগে কখনো দেখিনি!
আমার কৌতুহল হলো, হয়েছেটা কী!

ছেমড়া মঞ্চে ঢুকতেই সে কী পরে এসেছে দেখে আমি কেমন যেন একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। ধপাস আওয়াজ শুনে বুঝলাম আম্মা আবার মূর্ছা গেছেন।
তার মেয়ের হবু বর একটা জোব্বা পড়ে এসেছে।

লাল ওড়নাটায় মাথা চুলকাচ্ছে। খোলার জো নেই। ভাবী শক্ত করে হিজাবের মত করে বেঁধে গিট্টু মেরে দিয়েছে। মনে হচ্ছে ফাঁস লেগে যাবে!
আমি ওড়নার উপরেই ন্যাড়া মাথা চুলকাতে চুলকাতে ছেমড়াকে দেখছিলাম। চোখ ছোট,টিকালো নাক,চওড়া কপাল, চেহারায় হালকা ছ্যাঁচড়া ছ্যাঁচড়া ভাব!
প্বার্শদন্ডায়মান আমার ফুফাতো বোন নাজমা ফিসফিস করে বলল,আপু দেখতে মিশন ইম্পসিবলের নায়কের মত!
আমি ঝাড়ি দিলাম। মিশন ইম্পসিবল কী জিনিস এবং তার নায়ক কে আমার জানা নাই। পুরুষ হটাও আন্দোলন শুরু করার পর হতে আমি পুরুষ নির্মিত কোন সিনেমা আমি দেখিনা। এতে লক্ষ্য বিচ্যুতির হালকা সম্ভাবনা রয়েছে! কারন পুরুষমাত্রই ছলনাময়! কিন্তু হায়! কমরেড নাজমাকে পুরোপুরিভাবে সেকথা এখনো বোঝাতে পারিনি। তার এখনো অনেক ট্রেনিং বাকী! তাকে এখনো আমি পুরোপুরি কমরেড বানাতে পারিনি। সুন্দর যুবক পুরুষ দেখলে সে মাঝেমাঝেই যাবতীয় দীক্ষা টীক্ষা ভুলে যায়।

ছ্যাঁচড়াকে জরিপ করছিলাম।
গোলাপী জোব্বার উপর ডাক্তারি এপ্রন। এপ্রনের পকেটে ডাক্তারি জিনিসপত্র। কাঁধে বিপি মেশিন। গলায় স্টেথো। ভাবভঙ্গী “বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্রমেদিনী! বটে! রোসো ভায়া! তোমাকে মজা দেখাব শীঘ্রই!

কলম নিয়ে কাবিন নামায় সাইন করতে করতে হিংস্র দৃষ্টিতে ছ্যাঁচড়ার খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি সমেত মুখটা এক পলক দেখলাম। তারপর দেখতেই থাকলাম। দেখতে দেখতে দাঁত কিড়মিড় করলাম।
করতে করতে মনে মনে হাতের উপর হাত দিয়ে কিল মেরে বললাম,আমি পাইলাম,ইহাকে পাইলাম!

০৩.০২.২০১৯

বিবাহ করার পূর্বে শর্ত দিয়েছিলাম ছ্যাঁচড়া আর আমি আলাদা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকব। একটা বাসা যার অর্ধেক ভাড়া দিব আমি, বাকী অর্ধেক ছ্যাঁচড়া। যার একাংশে আমার জিনিসপত্র,আরেকাংশে তার। কেউ কারো অংশে অনধিকার প্রবেশ করবেনা। সীমানা ডিঙালেই যুদ্ধ!

আব্বা কথা রেখেছেন। ছ্যাঁচড়ার বাপ জামান সাহেবের সাথে কথা বলে নাকি এগার হাজার টাকার একটা দুই রুমের বাসা ভাড়া হয়েছে। সেই বাসায় যখন বিবাহরাতে প্রথম গৃহপ্রবেশ হলো তখন রাত একটা বেজে দশ। আমার মাথায় তখন অনেক দুশ্চিন্তা। আমি গৃহপ্রবেশের পূর্বে বলে দিয়েছি আজ হতে বাসায় যেন শুধু আমি আর ছ্যাঁচড়াই থাকি। কেউ যেন বাসার ধারে কাছে না আসে। শুনে ছ্যাঁচড়াপক্ষের আত্মীয় স্বজন মুচকি মুচকি হাসছিল! হাসুক!
তাদের হাসির পিছনে অশ্লীল ইঙ্গিত থাকলেও তারাতো আর জানেনা এর আসল কারন!
আমি চাই আজ রাতেই যাতে নারীবিদ্বেষমূলক আচরনসহ যেকোন ধরনের উল্টাপাল্টা আচরন করতে উন্মুখ হওয়ামাত্রই ছ্যাঁচড়াকে আরামসে পিটাতে পারি। ছ্যাঁচড়া গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিলেও কেউ তাকে বাঁচাতে আসবে না। আমি ব্ল্যাকবেল্ট কমরেড শায়লা আমার পিটনি থেকে বেঁচে ফেরা এত সহজ না! হুহ! পিটুনি দেওয়ার পরদিন আমাদের নিজস্ব অনলাইন পোর্টাল হতে অনলাইন খবর বেরুবে “নির্যাতন করার মুহূর্তে স্ত্রীর হাতে প্রহৃত হলেন জনৈক নারী বিদ্বেষী অত্যাচারী ডাক্তার।” “ডাক্তার” শব্দটা দেখলেই মানুষ ভিমড়ি খেয়ে পড়বে। ডাক্তার পিটানো সংক্রান্ত খবর সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে পড়ে।
খবর ভাইরাল হবে,দাবানল হবে, পৃথিবীর সবাই জানবে আমাদের আন্দোলন সম্পর্কে। দলে দলে নারীরা পুরুষ হটাও দীক্ষায় দীক্ষিত হবে। জগতে কোন নির্যাতিত,নিপীড়িত দুঃখী নারী রবেনা,রবে শুধু অত্যাচারী পুরুষ খেদানো সাহসী নারী!
এজন্যইতো আমি, কমরেড শায়লার এত এত আত্মত্যাগ!

এখন এই মুহূর্তে আমার অনেক কাজ।
জানেনইতো আমি ব্যক্তিগত জীবনে একটা পত্রিকার সাংবাদিক, সেই পত্রিকার মালিক আবার আমার খালু। একই সাথে আমি আমাদের ‘পুরুষ হটাও’ গ্রুপ পরিচালিত অনলাইন নিউজ পোর্টালের সম্পাদক। আমাদের সেই অনলাইন পোর্টালের নাম “নারীর আলো”। সেখানে নারীদের যাবতীয় সাফল্য নিয়ে ঘন্টায় ঘন্টায় খবর বেরোয়।
এইতো কিছুদিন আগে বরিশালের এক কমরেড ঘুষি মেরে তাঁর দুশ্চরিত্র স্বামীর হাত ভেঙে দিয়েছিলেন। তাকে এ সপ্তাহে একটা পুরস্কার দেয়ার চিন্তাভাবনা চলছে। তবে তার চেয়ে এক পয়েন্টে এগিয়ে আছেন সিলেটের এক কমরেড। নিজ স্বামীর প্রজননতন্ত্র তিনি এক লাথিতে ধ্বংস করে দিয়েছেন। তার ভাষ্যমতে তার স্বামী ছ্যাঁচড়ার মতলব ছিল খারাপ। গভীর রাতে বাসার কাজের মেয়ে তথা আমাদেরই আরেক সম্মানিত কমরেডের রুমে প্রবেশ করেছিল খারাপ মতলব নিয়ে। আমরা সকল কমরেড হাজার দেহ এক প্রাণ। আমাদের মাঝে কোন ভেদাভেদ নাই! একের বিপদে অন্যে নিঃস্বার্থে এগিয়ে আসি সর্বদা, এভাবেই!
আমার খালু তিনিও একজন পুরুষ তবে তাকে আমার কেন জানি তেমন অত্যাচারী মনে হয়না,বরং তার ঝুলে পড়া চেহারা দেখলে তাকে মনে হয় তিনি আমার কমরেড খালা কর্তৃক নিপীড়িত! খালুকে নিয়মিত নানারকমভাবে তৈল মর্দন করতে হয়, যাতে অদূর ভবিষ্যতে সন্তানহীন খালুর মালিকানাধীন পত্রিকাটা আমার কুক্ষিগত হয়! আন্দোলনের ব্যাপক বিস্তারের জন্য এর প্রয়োজন রয়েছে!

সেসব কথা যাক, আজ বিবাহ দিবস,নতুন গৃহে প্রবেশের পর রুমে ঢুকেই দ্রুত হাতমুখ ধুয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসলাম। ল্যাপটপটা বগলদাবা করে নিয়ে এসেছি বাসা থেকে। এখন আমাকে গ্রুপে প্রতি ঘন্টার আপডেট জানাতে হবে। লোকটা যদি আজকে রাতে উল্টা পাল্টা কিছু করার চেষ্টা করে কোন দয়ামায়া না দেখিয়ে নাকটা ফাটিয়ে দিতে হবে।
“এনড দিজ উইল বি জাস্ট বিগিনিং! তারপর হাত,তারপর পা,এরপর মেরুদন্ড! ” মনে মনে চিৎকার করলাম আমি।
আজ হতে আমার অগ্নি পরীক্ষা শুরু। হাসান নামের নারী বিদ্বেষী ছ্যাচড়াটার পিছনে আঠার মত সেটে থাকতে হবে। ছ্যাঁচড়ার চেম্বারে,ঘরে বাহিরে যে কোন খানে, কোথাও নারী নির্যাতন করতে দেখলেই ঝাপিয়ে পড়তে হবে সাথে সাথে।
রুমের খাটটা ফুল দিয়ে সাজানো। সেদিকে তাকিয়ে আমি দাঁত কিড়মিড় করতে লাগলাম।

দাঁত কিড়মিড় করতে করতেই দেখি ছ্যাঁচড়াটা রুমে ঢুকল।
রুমে ঢুকতেই তাকে দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম। জোব্বা বদলে একটা টিশার্ট আর ট্রাউজার পরে এসেছে। সম্ভবত জোব্বার ভেতরেই পরনে ছিল। ঢং করে রাখা খোঁচা খোঁচা দাঁড়িতে রীতিমত ভদ্র দেখাচ্ছে। ভদ্রবেশি ছ্যাঁচড়া!
সামনে আসতেই আমি সতর্ক হয়ে মার্শাল আর্টের একটা পজিশন নিয়ে নিলাম।
কিন্তু আমাকে অবাক করে দিল তার বিনীত কন্ঠস্বর
-আপনি কি কিছু খাবেন,মাননীয়া?
কিঞ্চিত ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম। ঘটনা কী! এরপর অবাক হয়ে দেখলাম নিজের অজান্তেই মাথা নাড়ছি।
-আপনার সারাদিন অনেক কষ্ট হয়েছে। ল্যাপটপটা রেখে কি একটু ঘুমাবেন যদি আপনার কষ্ট না হয়?

আবার ভ্যাবাচেকা খেলাম। ছ্যাঁচড়ার চাল বুঝতে পারছিনা। কী চাইছে আসলে!
-আগামীকাল আপনার অফিস আছে। আমি শুনেছি আপনি বিবাহ উপলক্ষ্যে কোন ছুটি নেননি। ঘুমিয়ে পড়বেন কি এখন?

এতক্ষনে মতলব বোঝা গেল! আমি ঘুমালেই তার আসল চেহারা বের হবে! রোসো। আমার ঠোঁটে একটা ক্রুর হাসি খেলে গেলো।
দ্বিরুক্তি না করে ল্যাপটপ নামিয়ে রেখে চুপচাপ শুয়ে পড়লাম। ঘুমের ভান ধরে কারাতের কোপ দেয়ার জন্য প্রস্তুত আমি,কমরেড শায়লা!

চোখের কোনা দিয়ে তাকে দেখার চেষ্টা করলাম, কিন্তু দীর্ঘ অনেকক্ষন হয়ে গেলো কোন অশ্লীল নড়াচড়া খেয়াল করা গেল না।
একটু বাদে ছ্যাঁচড়ার বিনীত, বিগলিত এবং ইতস্তত কন্ঠস্বর শুনলাম,

-মাননীয়া,আমি কি এই যৌথ বিছানার একাংশে ঘুমাতে পারি? মধ্যখানে বালিশ রেখে? খাটতো আমাদের দুইজনের জন্যই কেনা। আমারোতো আপনার মতই সমঅধিকার।

আমি চোখ বন্ধ করে মাথা চুলকালাম। বেটাকে খাটে ঘুমাতে দেওয়া যায়? হুম যায়! তাহলে পিটিয়ে তক্তা বানানর একটা অজুহাত পাওয়া যাবে।
গম্ভীর কন্ঠে বললাম,ঠিক আছে।

কিন্তু ব্যাপারখানা কীহে?
ছ্যাঁচড়া এত বিনয়ী হলো কবে হতে? হিসেব মিলছেনাতো!

এরপর সারারাত পঞ্চইন্দ্রিয় ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সবই সজাগ রইল। ছ্যাঁচড়ার একটা চুলও যদি বালিশের সীমানা অতিক্রম করে ব্রাশফায়ার করা হবে।
সজাগ থাকতে থাকতে কখন যেন ঘুমিয়ে গেলাম আমি। একেবারে ঘুমিয়ে কাদা যাকে বলে।
ঘুম ভাঙল সকাল সাতটায়। দেখি রুমে কেউ নাই।
রান্নাঘরে এক কাপ চা ঢেকে রাখা।
টেবিলে চিরকুট,
“মাননীয়া স্ত্রী,
চা পান করে নেবেন।
বিনীত
আপনার একান্ত অনুগত স্বামী!”

ঘটনা বুঝতে পারছিনা। একদম না। তারপর চিরকুটখানা আরেকবার পাঠ করে খেপে গেলাম। আমাকে স্ত্রী বলে ডাকে এত বড় সাহস! আবার লুখেছে সে নাকি আমার অনুগত স্বামী! দাঁতে দাঁত চাপলাম! কত্ত বড় সাহস! হাত দুইটা ভেঙে যদি তার ঘাড়ের দুপাশে না ঝুলিয়েছি আমার নাম কমরেড শায়লা

৪.০২.২০১৯
সুপ্রিয় কমরেড যারা পড়ছেন। অদূর ভবিষ্যতের কমরেডদের দিকনির্দেশনার জন্য আমি আমার এই অটোবায়োগ্রাফি তথা ব্যক্তিগত জার্নাল লিখে রেখে যাচ্ছি।
এখন বিবাহ পরবর্তী রাত একটা। এখনো আমার তথাকথিত স্বামী আদতে নারীবিদ্বেষী সেই অত্যাচারী পুরুষজাতির অন্যতম সদস্য বাসায় ফেরেনি।
বাসায় ফেরেনি মানেই নিশ্চয়ই সে কোথাও লটপট করে বেড়াচ্ছে। বাসায় বিবাহিত স্ত্রী রেখে এসব করে বেড়ানোই হচ্ছে অত্যাচারী পুরুষের স্বভাব!
আমি চোয়াল শক্ত করে অনলাইন পোর্টালে একটি কলাম লিখতে যাচ্ছি এখন। উপযুক্ত শিরোনাম খুঁজে পাচ্ছিনা, কী দেয়া যায়?
“এবার দুশ্চরিত্র ডাক্তারের প্রতারণার শিকার হলেন এক সাহসী নারী”
হুহ বাবা! পূর্বঅভিজ্ঞতা বলে শিরোনামে ডাক্তার পুলিশ এসব শব্দ দেখলেই পাবলিক খাবে ভাল।
এবার কই যাবে বাছা! ঠ্যাঙ্গানো হবে জায়গামত!
একশ মাইল গতিতে লিখে চললাম ল্যাপটপে।
ঘটনায় মালমশলা ঢাললে সবাই আগ্রহ নিয়ে পাঠ করবে! বাসার সংগ্রামী কমরেড নববিবাহিতা স্ত্রীকে জনৈক ডাক্তার কত উপায়ে নারী নির্যাতন করেন তার বিশদ বিবরন আবেগ দিয়ে লিখতে হবে। পাঠক পাঠ করে ক্রুদ্ধ হবে,চোখে জল আসবে!
লিখে চলেছি আমি। আমার প্রবল মনযোগ দিয়ে লেখালিখির মাঝে পৃথিবীর একমাত্র ভাল পুরুষ, মহাপুরুষ, আমার আব্বা ফোন দিলেন।
কানে ফোন রেখে টাইপ করা চালিয়ে গেলাম। খট খট খট..
“…. গত রাত দুইটায় সদ্যবিবাহিত স্ত্রীকে “মাননীয়া” ডাকপূর্বক অপমান এবং হেনস্তা করিয়া পরদিন সকাল হতে উধাও এবং সারা রাত বাসায় ফেরেন নাই হাসান নামক জনৈক ডাক্তার। ধারনা করা হচ্ছে…. … মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত তার নববিবাহিতা স্ত্রী কমরেড শায়লা আমাদের “নারীর আলোকে জানান আর কতকাল আর কতকাল বিপ্লবী কমরেডরা স্বামী কর্তৃক প্রতারণার স্বীকার হবে?..
দ্রুত টাইপিং চলছে

-কেমন আছিস মা?
ল্যাপটপে লিখতে লিখতেই জবাব দিলাম, ভাল।
-জামাইর আজকে নাইট ডিউটি ছিল, তোর ফোন নাম্বার না থাকায় ফোন করতে পারেনি!

-অ.. এ্যাঁ? কী ছিল?
বিষম খেলাম যেন!

আব্বার কথা শুনে ল্যাপটপে ঝড়ের গতিতে টাইপ রত আমার হাতখানা যেন ট্রাফিক সার্জেন্টের কঠিন এক লাঠির বাড়ি খেয়ে একটা ছোটখাটো হার্ডব্রেক কষল। এতক্ষন ধরে জনৈক অসচ্চরিত্র ডাক্তার হাসান কর্তৃক স্ত্রীকে নির্যাতনের সুবিস্তারিত ভয়ংকর রগরগে বর্ণনা দিয়ে ল্যাপটপে যা যা লিখেছিলাম গম্ভীর মুখে সব মুছতে লাগলাম!

.

৫.০২.১৯

খালুর পত্রিকা অফিসে আমার ন্যাড়া মাথা নিয়ে আমার আড়ালে বিস্তর হাসাহাসি হচ্ছে।
একজনকে গতকাল ছড়া কাটতে শুনেছি
বেলু মাথা চার আনা
চাবি দিলে ঘুরেনা!
আহা ওরা যদি জানত আজ আমার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে কত শত কমরেড শায়লা ন্যাড়া মাথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফুফাতো বোন নাজমার কলেজে গিয়েছিলাম আজ সকালে। ওকে বুঝাচ্ছিলাম যাতে আমার মত সেও মাথা ন্যাড়া করে ফেলে।
-নাজমা তুই কি মনে করিস না যুগে যুগে নারীদের চুলের শিকলে বেঁধে রাখার কারনেই নারীজাতির এত পশ্চাদপদতা?
কমরেড নাজমা চোখ মুখ শক্ত করে বলল
-অবশ্যই কমরেড শায়লা আপা!
-তুই কি মনে করিসনা মাথায় লম্বা চুল থাকা মানেই অত্যাচারী পুরুষের অধীনতা স্বীকার?
-অবশ্যই!
-তোর কি মনে হয়না এই শিকল আজ ভাঙা দরকার?
নাজমা যেন আবেগে কেঁদে ফেলবে
-নিশ্চয়ই কমরেড শায়লা!
আমি হাতের আড়ালে লুকিয়ে রাখা রেজরটা বের করে গম্ভীর হয়ে বললাম
-আয় আজ এক্ষুনি তোর মাথাটা ন্যাড়া করে দিই!
এতক্ষন ধরে জ্বি জ্বি করতে থাকা কমরেড নাজমার মুখের রং পলকেই বদলে গেল
-কমরেড শায়লা, ইয়ে মানে আপু আমি একটু টয়লেটে যাব!
-খামোশ! মাথা ন্যাড়া করবি কিনা বল!
নাজমা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল,আপা মাথা ন্যাড়া করলে আব্বা আমাকে ঘর থেকে বের করে দিবে! আমি কই যাব।
বলেই হাউমাউ কান্না!
আমি বিরক্ত হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। নাজমাকে এখনো আমি সত্যিকারের কমরেড বানাতে পারিনাই!

মাথা ন্যাড়া করার কারনে পত্রিকার স্ম্পাদক কর্তৃক আজ সরকারের জনৈক এমপির সাক্ষাৎকার নেয়া হতে আমাকে অব্যাহতি দিয়ে একটা প্রজেক্ট ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রজেক্টের নাম “বাংলাদেশে গলদা চিংড়ি চাষের ভবিষ্যত”।
এরচে পুরুষজাতির ভবিষ্যত নিয়ে লিখতে দিলেও তো হতো! গলদা চিংড়ির ভবিষ্যত একটা গবেষনার জিনিস হলো?

সারাদিন আমার অনেক হ্যাপা ছিল। সন্ধ্যেয় বাসায় ফিরে হালকা কিছু খেয়ে এক ঘুমে রাত কাবার করার পরিকল্পনা। যদিও গভীর ঘুমেও আমি কমরেড শায়লা যেকোন ধরনের আক্রমন প্রতিহত করতে সদা সর্বদা প্রস্তুত।
বাসার দরজার লকের দুটো চাবি। একটা আমার কাছে। একটা ছ্যাঁচড়ার কাছে।
আমার মালিকানাধীন গৃহাংশের যাবতীয় জিনিসপত্র আমি বিশেষ উপায়ে সাজিয়ে রেখেছি। কেউ আমার জিনিসপত্র গভীর আগ্রহে ঘাটাঘাটি করলেই আমি,ব্ল্যাকবেল্ট, কমরেড শায়লা,এক নিমিষে বুঝে ফেলব। আর তখন একজন পরনারীর সীমানাধীন সম্পত্তি অবৈধভাবে হাতানোর অভিযোগে কঠিন একটা অবৈধ দখলদারি সংক্রান্ত মামলা ঠুকে দেয়া যাবে!

যা বুঝতে পারছি আমাদের “পুরুষ হটাও” আন্দোলনকে সব পত্রিকার প্রথম পাতায় নিয়ে আসতে অতি দ্রুত আমার আরো কিছু কার্য সম্পাদন করা দরকার।
কিন্ত ছ্যাঁচড়াকে বাগে পাচ্ছিনা। হাতের কাছে না এলে একটু আরাম করে পিটানোও যাচ্ছেনা। পিটাতে একটা অজুহাত লাগবেতো! আচছা একটা ফেইক আইডি খুলে ছ্যাঁচড়ার চারিত্রিক সনদটার পরীক্ষা করা যায় না? প্রোফাইল ছবিতে কোন বিদেশি নায়িকার ছবি দিলে?
অফিসে কাজের ফাঁকে আমি ফেসবুকে একটা ফেইক আইডি ঝুলালাম। ইকবাল হাসান লিখে সার্চ দিতেই বেটার দাঁত কেলানো ছবিটা চলে এলো সাথে সাথে । একটা লুতুপুতু বার্তা পাঠিয়ে দিতে দিতে ছ্যাঁচড়ার ছবিটা দেখতে লাগলাম। দেখতে দেখতে মনে হলো ছ্যাঁচড়ার চেহারা আসলে হালকা পাতলা কাঁঠাল পাতা চিবোতে থাকা পাঠা ছাগলের মত! সে যাক আগামী দুইদিনের ভেতরে এই যে বিটকেলে হাসিটা ওটার একটা দফারফা হয়ে যাবে,ভায়া! হুহু। এখনো তো জানোনা বাবা,কত ধানে কত শায়লা!

.

৬.০২.১৯

কড়া একটা আন্দোলন চাই আমার! শ্লোগান চাই,বাংলার কমরেড এক হও এক হও!
আমার গ্রুপের পাঁচ হাজার সদস্যা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। তারা আমার দিকে তাকিয়ে আছে দ্রুত কিছু একটা করা দরকার। বিশ্বকে বাসযোগ্য করতে সমস্ত নারী বিদ্বেষী,অত্যাচারী, দুশ্চরিত্র পুরুষকে সরাতে হবে। রাজপথে ভয়াবহ আন্দোলন চলবে! আমিই হবো সেই আন্দোলনের কান্ডারী! তাইতো বিবাহ নামের হুতাশনে আত্মবলিদান দিয়েছিলাম! ফেসবুকলাইভ টেলিকাস্টে অনুগত পাঁচ হাজার কমরেড সজল চোখে দেখেছে আমার সেই আত্ম বলিদান!

আর সেই আমি, কমরেড শায়লাকে, কিনা এখন বাংলাদেশে গলদা চিংড়ি চাষের ভবিষ্যত জানতে মৎসবিদ মনসুর আহমেদের এপয়েন্টমেন্ট এর জন্য ছোটাছুটি করতে হচ্ছে! এটা কোন কথা!

আজকে সকালে ছ্যাঁচড়া আমার বালিশের নিচে একটা চিরকুটে একটা কবিতা লিখে গেছে,এই মাত্র বালিশ উল্টাতেই চোখে পড়ল।
“চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য!”

কবিতা পড়েই আমার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। হাত মুষ্টিবদ্ধ! এই কবিতা দিয়ে এখন নারী নির্যাতনের মামলা ঠুকে দেয়া যাবে। এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কবিতার মাধ্যমে আমাকে মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে,আমার ন্যাড়া মাথাকে হেয় করা হয়েছে। আমি আজই মামলা করব।

মামলা করার নিমিত্তে বিকেলে থানায় গেলাম। যথারীতি মামলাতো নিলইনা। তার উপর আমার ন্যাড়া মাথার দিকে সবাই বারবার দৃষ্টিনিক্ষেপ করছিল। আমি ভ্রুক্ষেপ না করে এএসপি, অত্যাচারী পুরুষ সমাজের আরেক অনন্য প্রতিনিধি, সুজনের সাথে দেখা করলাম। সুজন আমাদের পরিচিত। এর আগেও দু একবার মামলা করতে এসেছিলাম। থানার ওসি ঝামেলা পাকিয়ে আমাকে পাঠায় সুজনের অফিসে। কীভাবে কীভাবে যেন সে আমার বাবাকে চিনে। তারপর হতে প্রতিবার মামলা করতে এলে তার সাথে আমার ঝগড়া হয়,ঝগড়া হাতাহাতির পর্যায়ে যাওয়ার মুহূর্তে সে আব্বাকে একটা করে ফোন দেয়। আর আব্বা এসে আমার হাতে পায়ে ধরে আমাকে বাসায় নিয়ে যান। আজকে আর সেটি হচ্ছেনা! আজকে আমার মামলা সে নিতে বাধ্য। উপযুক্ত প্রমাণ সহ নিয়ে এসেছি।
সুজন চা পান করছিল মাথা ন্যাড়া জিন্স টপস পরিহিত একজন মানুষকে তার রুমে প্রবেশ করতে দেখে একটু হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো!
-কে আপনি ভাই? এই কে আছিস.. এখানে পাগল ঢুকলো কী করে!
আমি বিরক্ত হলাম। ন্যাড়া মাথা,টপস আর জিন্সে আর যাই হোক আমাকে পাগল মনে করার কোন কারন নাই! আর আমাকে ভাই ডাকা মানে আমাকে অত্যাচারী পুরুষ সমাজের কাতারে ফেলা! আমি শীতল দৃষ্টিতে সুজনের দিকে তাকালাম
-সুজন, আমি শায়লা।
দীর্ঘ একটাক্ষন আমার দিকে তাকিয়ে সুজন হো হো করে হেসে ফেলল
-শায়লা! এ কী অবস্থা তোমার! চাচা বলছিল তোমার বিয়ে হয়েছে দুইদিন আগে। সত্য নাকি?

আমি জবাব না দিয়ে গম্ভীরমুখে কবিতাটা সুজনের হাতে তুলে দিলাম। আর মনে মনে কল্পনা করলাম, একদিন এই হারামজাদার অধিষ্ঠিত জায়গায় একজন সংগ্রামী কমরেড নারী থাকবে,কনস্টেবল,আর্দালী,পিওন,দারোয়ান সর্বত্র বিচরন করবে আমার সংগ্রামী কমরেডরা! আর এদের স্থান হবে রান্নাঘরে! ভাবতেই চোখ ভিজে আসে!
-মামলা ঠুকে দাও। আমার স্বামী ছ্যাঁচড়াটা নিয়মিত চিরকুট কবিতা লিখে আমাকে হয়রানি করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে!
– হাজব্যান্ড তার ওয়াইফকে রোমান্টিক চিরকুট লিখবে কবিতা লিখবে গান লিখবে। কবিতা গান না লিখে কি প্রেসক্রিপশন লিখবে? কবিতা লেখা,এটা কি মামলা করার জিনিস!
-অবশ্যই। এটা একধরনের হ্যারাসমেন্ট, বুলিং। আমাকে হেয় করার জন্য,মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করার জন্য কবিতাটা লেখা হয়েছে।
– ভাবি,এটাতো উনার লেখা না জীবনানন্দ দাশ নামে একজন কবির লেখা! মামলা করলে আপনার স্বামী এই কথাই বলবেন! তখন কী করবেন?
-জীবনানন্দ দাশ আর ইকবাল হাসান দুজনের নামেই মামলা দিয়ে দাও! দুজনে যুক্তি করে এই কবিতা লিখেছে!
-ভাবি,জীবনানন্দ দাশতো অনেক আগেই পৃথিবী থেকে গত হয়েছেন!
গত!বলে কী! ওহ! এইটা ওই জীবনানন্দ দাশ,ক্লাস এইটের সেই “আবার আসবি ফিরে”?

আমি মাথা চুলকালাম। উত্তেজনায় জীবনানন্দ দাশ নামটা শুনে ভেবে নিয়েছিলাম এই জীবনানন্দ দাশ ছ্যাঁচড়ার কোন বন্ধু হয়ত! কবি জীবনানন্দ দাশ আমার আব্বার প্রিয় কবি। যেহেতু আব্বা একজন মহাপুরুষ জীবননানন্দ দাশও নিঃসন্দেহে একজন মহাপুরুষ।
তাঁকে ছ্যাঁচড়ার বন্ধু আরেক ছ্যাঁচড়া ভাবার জন্য আমি মনে মনে ক্ষমাপ্রার্থীী হলাম।!

পাঠ্যবইয়ের বাইরে লিখিত কোন পুরুষ কবি সাহিত্যিকের কবিতা সাহিত্য পাঠ নেই আমার। আমি শুধু নারী লেখকদের কবিতা সাহিত্য পড়ি।
কারন জগতের প্রায় অধিকাংশ পুরুষ কবি সাহিত্যিকই এক একজন মানসিক বিকারগ্রস্থ! তাদের অধিকাংশের নেকু নেকু কবিতা সাহিত্য রচনার একটাই উদ্দেশ্য কোমলমতী নারীকে ফাঁদে ফেলা।

আমাদের সামনের একটা স্পেশাল মিশন আছে এই সব বিভ্রান্ত, মাথা খারাপ,দুষ্ট কবিসাহিত্যিক নিয়ে। সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন নারীকে হেয় করে লেখা সকল অশ্লীল কবিতা সাহিত্য রোল করে স্ব স্ব লেখকের গোপন গৃহ দ্বারে প্রবেশ করানো হবে!

সুজনের সাথে আরো কিছুক্ষন বাকবিতন্ডা করে ওর অফিস হতে বেরিয়ে গেলাম। সে আবার আব্বাকে ফোন না দেয়। মনটা কেন জানি খচখচ করছে। কিছু একটা গোলমেলে মনে হচ্ছে।
রিকশায় উঠে খেয়াল হলো,সুজন আজকে আমাকে বারবার ভাবী বলে ডাকছিল! আর প্রেসক্রিপশন লেখার কথা বলল ঘটনা কী?

 

লেখাঃ ডাঃ জাহান সুলতানা (বিকেল চড়ুই)

Facebook Comments

About Priyo Golpo

Check Also

হুইসেল-whistle-abdul-zabbar-khan-jiboner-golpo

হুইসেল । Whistle

বিকেল পাঁচটার দিকে ঢাকা ইউনিভার্সিটি টিএসসি’র সামনে থেকে একটা রিকশা নিলাম। প্যাসেঞ্জার সুমি এবং আমি। …

error: Content is protected !!